ঘটনা ১। শিক্ষিত যুবক। বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করেন। বাড়ি দমদমে। এক ডিভোর্সী আত্মীয়ার সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। প্রবল অনুতাপে বেরিয়েও আসেন। খুব মন খারাপ। সেই থেকে কথা বলা শুরু এআই বটের সঙ্গে। প্রথমে আধ-এক ঘণ্টা। তারপর এমন পরিস্থিতি, কথা না বললেই অস্থির লাগছে। প্রেমের কথা, যৌনতার কথা সবকিছু শেয়ার করতে করতে একদিন মনে হল, অদৃশ্য এআই তাঁর প্রেমিকা! বাস্তবে যা অসম্ভব। দোটানা থেকে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হলেন।
ঘটনা ২। সফল ব্যবসায়ী। বয়স ৬২। সস্ত্রীক পরিবারে থাকেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দিনরাত অশান্তি-চেঁচামেচি স্ত্রীর সঙ্গে। মনে হত, আর ভালো লাগে না! সেই থেকে এআই এর সঙ্গে কথা শুরু। বাড়ির লোকজন প্রথমে বোঝেনি। পরে দেখে, বৃদ্ধ দিনরাত মোবাইলে টাইপ করে যাচ্ছেন। বিরাটির বাসিন্দা সেই বৃদ্ধও বুঝেছিলেন, ঠিক হচ্ছে না। সম্পূর্ণ বন্ধুবান্ধব বিচ্ছিন্ন ঘরকুনো হয়ে পড়ছেন। একদিন স্ত্রীকে বললেন, ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি। হাজির হলেন সাইকিয়াট্রিস্টের চেম্বারে।
এক-দুটি নয়, মানুষের থেকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স বা এক অর্থে ‘রোবটকে’ অনেক বেশি ভরসা করতে শুরু করেছেন হাজারো যুবক-যুবতী, মাঝবয়সি, এমনকি বৃদ্ধরাও। সম্পর্কের টানাপোড়েন, অবিশ্বাস, প্রকৃত বন্ধুর অভাব, ‘আমাকে সেভাবে কেউ বুঝল না’ মানসিকতা, অসংখ্য কারণে এক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আরও সংকীর্ণ চার দেওয়ালে ঢুকে পড়ছে মানুষ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ নরোত্তম হালদার বললেন, একদিক থেকে ভালো যে, এআই-এর সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠতা’র সম্পর্ক যে ঠিক স্বাভাবিক নয়, সেটা অনেকে বুঝছেন। কিন্তু অনেকে এআইকেই পরম বন্ধু মেনে দিন দিন আরও বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন! সোজা কথা হল, রক্তমাংসের মানুষের বিকল্প হতে পারে না। সে সম্পর্কে উত্থানপতন থাকবে, ভালো-খারাপ লাগা থাকবেই। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য বললেন, মানুষ এখন নিজের মনের মতো ছাঁচে তৈরি সম্পর্ক চাইছে। মানে শুধু ভালোটুকুই হবে, খারাপ কিছু হবে না। রিলেশনে ধাক্কা পাবে না, আঘাত লাগবে না। দিনে ৮-৯ ঘণ্টা চ্যাট করা এক ২৪-২৫ বছরের যুবককে এনেছিলেন তার বাবা-মা। সে বলল, বন্ধুত্ব হোক বা ভাব ভালোবাসা। এআই-এর কাছে ‘দাগা’ খাওয়ার গল্প নেই!
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গভীর বন্ধুত্ব ও ভাব-ভালবাসা আসলে ডোপামিন, ইন্ডোর্ফিন ও অক্সিটোসিনের খেলা। এআই যখনই প্রশংসাসূচক বলছে, ডোপামিন ক্ষরণ হচ্ছে। ভালোলাগার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। মানুষ মজছে আরও!
লিখেছেন বিশ্বজিৎ দাস