আনন্দ সাহা, লালবাগ: প্রথমে ওয়াকফ আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হিংসার ঘটনা। সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আবহ। এই দুই ঘটনার জেরে প্রায় এক মাস ধরে সাবেক নবাবি মুলুক মুর্শিদাবাদে পর্যটকের দেখা নেই। পর্যটক না থাকায় শুনশান দর্শনীয় স্থানগুলি। ফলে একপ্রকার হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষজনকে। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে শহরের ছোট বড় ব্যবসায়ী থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষের কপালে। শহরের পর্যটনের উপর জীবনজীবিকার জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল গাইড থেকে টাঙ্গাচালক প্রভৃতি পেশার মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। পরিবারের সদস্যদের মুখে দুই বেলা দু মুঠো ভাত তুলে দেওয়াই এখন তাদের কাছে খুবই সমস্যার হয়ে উঠেছে।
সাবেক নবাবি মুলুক মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদাবাদ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নবাবি আমলের স্মৃতিবিজড়িত একাধিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্য নিদর্শন। নবাবি ইতিহাসের সাক্ষী হতে সারা বছর ধরে স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে মুর্শিদাবাদ শহরে। যদিও শহরের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটনের ভরা মরসুম। এই ভরা মরসুমে প্রতিদিন দেশ বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক মুর্শিদাবাদ শহরে আসেন। শীতে ভরা মরসুমের মত বছরের অন্যান্য সময়ে পর্যটকের ঢল না নামলেও সংখ্যাটা নেহাত খারাপ থাকে না। তবে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ এবং বর্ষণমুখর দিনগুলিতে পর্যটকের সংখ্যা বরাবরই কম থাকে। চলতি বছরে শীতের মরসুমের পরেও পর্যটকরা আসছিলেন। গত মাসে জঙ্গিপুর মহকুমায় হিংসার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পহেলগাঁএ জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিরীহ পর্যটকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর এই দুই ঘটনায় দর্শনীয় স্থানগুলি পর্যটক শূন্য হয়ে পড়েছে। মুর্শিদাবাদ শহরের এক হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, প্রতি বছর বৈশাখে কম বেশী কয়েকদিন অসহ্য গরম থাকলেও পর্যটকরা আসেন। তবে সংখ্যাটা কম থাকে। চলতি বছর উপুর্যুপরি দুটি ঘটনায় গত একমাস ধরে পর্যটকরাএকেবারেই আসছেন না । শহরের অপর এক হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, ওয়াকফ আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কেন্দ্র করে হিংসার ঘটনা সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই পর্যটকরা শহরে আসছিলেন না। এবার যুদ্ধ আবহ শহরের পর্যটনে আরও বিপর্যয় ডেকে আনল। পর্যটন নির্ভর সব পেশার মানুষ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাত গুটিয়ে বসে থাকছেন। ব্যবসায় এতটাই মন্দা চলছে পুঁজি থেকে কর্মচারীদের বেতন মেটাতে হচ্ছে। পর্যটকরা নেই, তাই দেখা মিলছে না গাইড, টাঙ্গা চালক, ডাব, শসা বিক্রেতা এবং ফেরিওয়ালাদের।
মুর্শিদাবাদ শহরে ট্যুরিস্ট গাইডের কাজ করেন রতন চক্রবর্তী, মদন রায়, মঙ্গল ঘোষেরা। মদন রায় বলেন, এপ্রিলের ১০ তারিখের পরে থেকে পর্যটকের সংখ্যা নেই বললেই চলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থেকেও চা খাওয়ার পয়সা জোগাড় হচ্ছে না। নসিপুরে একটি চায়ের দোকানে বসেছিল টাঙাচালক বাবু শেখ। বাবু শেখ বলেন, প্রায় এক মাস হতে চলল পর্যটকের দেখা নেই। প্রথম দুই সপ্তাহ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভাড়ার আশায় ঘুরে ঘুরে হন্যে হয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছে। তাই এখন আর যাচ্ছি না। কাঠগোলাপ বাগানের মূল গেটের পাশে খাবারের দোকান রয়েছে দিলীপ রজকের। দিলীপ বলেন, এই দোকানের রুজিরোজগার থেকেই সংসার চলে। গত একমাস ধরে চরম সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলছি। মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ অ্যান্ড কালচারাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটির সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, দুই ঘটনার প্রভাব মুর্শিদাবাদের পর্যটনে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পর্যটন নির্ভর বিভিন্ন মহল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।



