অমিত চৌধুরী, তারকেশ্বর: কার্তিক মাসে শ্যামা কালীপুজোর আগের দিন, শনিবার অনুষ্ঠিত হল জাঙ্গিপাড়ার আঁটপুরের আনরবাটী গ্রামের বড়ো কালীর পুজো। প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো এই পুজোর বেদী এখনও মাটির। কোনো স্থায়ী মন্দির নেই। মণ্ডপে প্রথা মেনে ব্যবহার হয় তালপাতা। প্রতিমার উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। শিব ও নীল রঙের রক্ষাকালী মূর্তির মুখ শিল্পী হাতে তৈরি করেন। মূর্তি তৈরিতে ছাঁচ ব্যবহার হয় না। নীল রংয়ের দু’হাতের কালী মূর্তি। বলির প্রচলন আছে। চতুর্দশীতে রক্ষাকালীর এই পুজো শেষে সূর্যোদয়ের আগেই বিসর্জন হয় নিজস্ব পুকুরে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই গ্রামে শ্যামা কালীপুজো হয় না। তার আগের দিন ছেলে কালী, মেজ কালী, নেড়া কালী সহ আরও কয়েকটি কালীঠাকুরের পুজো হয়। তবে মূল পুজো হল গ্রামের বড়ো মা’র। কথিত, এই গ্রামে একসময় মহামারী হয়েছিল। গ্রাম ছেড়ে ভয়ে মানুষ পালাতে শুরু করেছিল। শবদাহ করার লোক পর্যন্ত নেই। গ্রামের মাঠেই শুরু হয়েছিল শবদাহ। তখন হরিপ্রবোধ মিত্র নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে রাতে বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছিলেন। মাঝপথে বয়স্ক এক মহিলার সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়। মহিলা বাড়ি ছাড়ার কারণ শুনে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, গ্রাম ছেড়ে তোদের যেতে হবে না। তোরা সবাই মিলে গ্রামের মাঠে যেখানে শবদাহ হচ্ছে সেখানে পুজো শুরু কর। এরপর গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায়, সরকার, বিশ্বাস, দত্ত, দে সহ বহু পরিবার শুরু করে পুজো। মিত্র বাড়ি হয় সেবায়েত। বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ি হয় পুরোহিত। রক্ষা কালীর এই পুজো শুরুর পর থেকে ধীরে ধীরে গ্রামে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসে। দেবীর নির্দেশ অনুযায়ী, এখনও মণ্ডপে তালপাতা ব্যবহার করা হয়। বেদী পঞ্চমুণ্ডের আসন। পাকা মন্দির করার নির্দেশ নেই। কারও থেকে কোনো চাঁদা নেওয়া হয় না। কুমোরবাড়ি থেকে বিশাল প্রতিমা মণ্ডপে আনার জন্য গ্রামের বাছাই করা যুবকদের নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান ও নিরামিষ খাওয়া দাওয়া করতে হয়। দেবীর প্রসাদ চিনির সন্দেশ। দেবীকে ঘিরে রয়েছে অনেক অলৌকিক ঘটনা। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই এলাকার বাস করতেন খোকা রায়। বড়ো কালীর কাছে বাঁশি বাজাতেন তিনি। একবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মারা গিয়েছেন বলে গ্রামে রটে যায়। মৃতদেহ ঘরে পাঠানো হয়েছে জানতে পারেন গ্রামের বাসিন্দারা। কালী পুজোর আগের দিন বাড়িতে স্ত্রীকে ডাকাডাকি করলে স্বামীর মৃত আত্মা এসেছে ভেবে ভয়ে দরজা খোলেননি স্ত্রী। এরপর দেখা যায়, কালীমন্দিরে বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন খোকা। অবাক এই ঘটনাটিকে বড়ো কালীর মহিমা বলে মনে করে গ্রামের মানুষ। সন্তানহীন অনেকে আশীর্বাদ নিতে আসেন এখানে। পুজোর আগের দিন কয়েক লক্ষ মানুষ আসেন।



