নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: আট মাসের আইনি লড়াইয়ের অবসান। মধ্যমগ্রামের ট্রলিব্যাগ কাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত মা ও মেয়েকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিল বারাসত আদালত। সাজা প্রাপকরা হল মেয়ে ফাল্গুনী ঘোষ ও মা আরতি ঘোষ। খুন হয়েছিলেন সুমিতা ঘোষ, সম্পর্কে যিনি ফাল্গুনীর পিসিশাশুড়ি। মৃতদেহ ট্রলিব্যাগে ভরে কুমোরটুলির গঙ্গার ঘাটে ফেলতে এসে ধরা পড়েছিল মা-মেয়ে। সোমবার দু’পক্ষের আইনজীবীদের আড়াই ঘণ্টা সওয়াল জবাবের পর বারাসত আদালতের সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা কোর্টের বিচারক প্রজ্ঞাগার্গী ভট্টাচার্য (হোসেন) রায় ঘোষণা করেন। বিএনএসের খুনের ধারায় মা ও মেয়ের আমৃত্যু কারাদণ্ডের সঙ্গেই এক লক্ষ টাকা জরিমানাও হয়েছে। অনাদায়ে ছ’মাসের জেল। অন্যদিকে তথ্য প্রমাণের ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড। ৫০ হাজার টাকার জরিমানা। অনাদায়ে আরও ছয় মাসের জেল। তবে, উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্রমাণ লোপাটের ধারায় মা ও মেয়েকে প্রথমে সাত বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। পরে খুনের সাজা খাটতে হবে। রায় শোনার পরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ফাল্গুনী। মা আরতি অবশ্য নির্বাক।
জানা গিয়েছে, মূলত সুমিতাদেবীর সোনা ও সম্পত্তির লোভেই পরিকল্পনা করেই নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি। খুনের পর মৃতদেহ থেকে সোনার গয়না খুলে বাজারে বিক্রি করেছিল ফাল্গুনী ও তার মা। এমনকি সুমিতাদেবীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অনলাইনে সোনার গয়না অর্ডার দিয়ে টাকাও পেমেন্ট করেছিল। এরপর কলকাতা থেকে বড় ব্যাগ কিনে নিহতের পা ভেঙে, দেহ দুমড়ে-মুচড়ে তাতে ভরে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে কুমোরটুলি ঘাটে গঙ্গায় ফেলতে গিয়েছিল মা ও মেয়ে। তখনই হাতেনাতে ধরা পড়ে দু’জন। ফরেন্সিক রিপোর্ট, টেকনিক্যাল সাপোর্ট, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সহ ৩২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে দোষী সাব্যস্ত মা ও মেয়েকে এদিন সাজা শুনিয়েছেন বিচারক।
এদিন ভরা এজলাসের একদিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন হলুদ চুড়িদার পড়া ফাল্গুনী ও নীল চুড়িদারে আরতি ঘোষ। বিচারক হাজির হতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ফাল্গুনী। বিচারক তাদের কাঠগোড়ায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। সেখানে দাঁড়িয়েও ফাল্গুনীকে কাঁদতে দেখে যায়। বিচারক তাদের বলেন অপরাধের ন্যূনতম সাজা যাবজ্জীবন ও সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড। এক্ষেত্রে আপনাদের কী বলার আছে? বিচারকের কাছে ফাল্গুনী বলেন, আমি নির্দোষ। আরতি অবশ্য কিছুই বলেননি। এরপর সরকার পক্ষের আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় নৃশংস খুনের ঘটনার কিছু উদাহরণ বিচারককে শোনান। খুনের ঘটনাকে বিরল থেকে বিরলতম হিসেবে বিচারকের কাছে তুলে ধরতে সওয়াল করেন সরকার পক্ষের আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায়। এই ধরনের খুনে অভিযুক্ত মহিলাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণার উদাহরণ হিসেবে একাধিক রাজ্যের রায় বিচারকের সামনে তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি অভিযুক্তের আইনজীবী মা ও মেয়েকে নির্দোষ বলে প্রমাণ করতে বিভিন্ন যুক্তি খাড়া করেন। দু’পক্ষের আইনজীবীর সওয়াল জবাব শুনে বিচারক রায় ঘোষণা করেন। এজলাসে এদিন আগাগোড়া হাজির ছিলেন নিহত সুমিতা ঘোষের বোন শিপ্রা ঘোষ। তিনি এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এই প্রসঙ্গে বারাসত পুলিশ জেলার সুপার প্রতীক্ষা ঝাড়খড়িয়া বলেন, আটমাসের মধ্যে মামলার সাজা ঘোষণা হল। এটা গোটা টিমের সাফল্য।