সংবাদদাতা, রামপুরহাট: বিদেশিনী হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯জনের মৃত্যুর পরই তারাপীঠের হোটেলগুলিতে একযোগে সেফটি অডিট শুরু করল প্রশাসন। অডিটের প্রথম দিনেই হাতে থাকা সুরক্ষা ‘চেকলিস্ট’ মিলিয়ে কাগজপত্র খতিয়ে দেখতে গিয়ে তাজ্জব হয়ে গেলেন আধিকারিকরা। অনুমোদনহীন বহুতল থেকে শুরু করে লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা, একের পর এক জালিয়াতি ও নিয়মভঙ্গের বিস্ফোরক চিত্র উঠে এল তদন্তে।
বৃহস্পতিবার পুলিশ, ফায়ার, বিদ্যুৎ ও পিডব্লুউডি সহ বিভিন্ন দপ্তরের যৌথ টিম পাঁচভাগে বিভক্ত হয়ে একযোগে তারাপীঠজুড়ে অভিযানে চালায়। প্রতিদিন ৫০টি করে হোটেলের নিরাপত্তা খতিয়ে দেখার লক্ষ্য নিয়ে নেমেছেন তাঁরা। এদিন বিদেশিনী লাগোয়া ও মন্দির সংলগ্ন এলাকায় সেফটি অডিট টিমের সঙ্গে ছিলেন রামপুরহাট মহকুমা শাসক, মহকুমা পুলিশ আধিকারিক সহ ডেপুটি ম্যাজেস্ট্রেটরা। তাঁরা হোটেলগুলির কাগজপত্র ও পরিকাঠামোয় মারাত্মক ত্রুটি পেয়েছেন। যা দেখে তাজ্জব হয়ে যান তাঁরা। বিল্ডিংয়ের নকশায় জালিয়াতি করা হয়েছে। সাহাপুর গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে জি প্লাস ওয়ান বিল্ডিং প্ল্যানের অনুমতি নিয়ে তৈরি করে ফেলা হয়েছে জি প্লাস ফোর হোটেল। আবার কোথাও টিআরডিএর প্ল্যান বর্হিভূত হোটেল নির্মাণ হয়েছে। অনেক জায়গায় হাতবদল হলেও মালিকানা পরিবর্তন করা হয়নি। অধিকাংশ হোটেলেরই নেই সরাই লাইসেন্স কিংবা ফায়ার লাইসেন্স। যদিও অগ্নিকাণ্ডের দায় এড়াতে অনেকেই তড়িঘড়ি লাইসেন্সের জন্য নতুন আবেদন জমা করছেন।
রিসেপশন থেকে প্রতিটি ফ্লোরে ফাইবার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ফলস সিলিং, হোটেলে মজুত রয়েছে প্রচুর দাহ্য সামগ্রী। ইলেকট্রিকের মেন প্যানেল বোর্ডে খোলা তার কেটে ঝুলছে। নিয়মমাফিক ওয়ারিং করা হয়নি। মন্দির লাগোয়া প্রাচীন একটি বাড়িতেও চলছে দু’টি হোটেল। যেখানে ঢোকা-বেরনোর পথ বলতে মাত্র একটি সংকীর্ণ গলি। মাকড়সার জালের মতো ঝুলছে বিদ্যুতের তার। আগুন লাগলে দমকলের গাড়ি ঢোকা তো দূরের কথা, নেই কোনো জলাশয় বা জল মজুতের ন্যূনতম পরিকাঠামো। অধিকাংশ হোটেলে নেই ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম বা ফায়ার এগজিট। বোর্ডার রেজিস্টার ঠিক নেই। যাত্রীদের তথ্য থানায় জমা দেওয়ার সরকারি নির্দেশকে এতদিন বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছিল।
সামনেই কৌশিকী অমাবস্যা। তার আগেই সমস্ত হোটেলকে ন্যূনতম সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মহকুমাশাসক অশ্বিন বি রাঠোর। তিনি বলেন, হোটেলগুলির সুরক্ষা ব্যবস্থা আমরা পরীক্ষা করছি। প্ল্যান বহির্ভূত বহু হোটেল নির্মাণ হয়েছে। তবে সামনেই তারাপীঠের অন্যতম বড় উৎসব কৌশিকী অমাবস্যা। সেইসময় লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। পুণ্যার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের অগ্রাধিকার। সেকারণে হোটেলগুলির ন্যূনতম সুরক্ষা, ফায়ার, সিসি ক্যামেরা এসব চেক করা হচ্ছে। এরপরও পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা না করলে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।
চণ্ডীপুর মৌজায় বেআইনিভাবে চলা যে ১৫টি হোটেলকে বন্ধের নোটিস দেওয়া হয়েছিল। অডিট টিম পরিদর্শনে গিয়ে পর্যটক থাকতে দেখলে মালিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি এফআইআর দায়ের করার স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রশাসন। এদিনই মুরারই থানা এলাকার হোটেল মালিকদের নিয়েও জরুরি বৈঠকে বসে পুলিশ-প্রশাসন। পুলিশের তরফে হোটেল মালিকদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, অবিলম্বে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র, পর্যাপ্ত ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম এবং আপদকালীন বেরনোর পথ প্রস্তুত রাখতে হবে। কোনো গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।