সংবাদদাতা, লালবাগ: ঝাড়ু ও আজান দেওয়া থেকে তত্ত্বাবধান বা তদারকি। মসজিদের বিবিধ কাজের জন্য রয়েছেন ১২ জন স্থায়ী কর্মচারী। মসজিদের এই ১২ জন স্থায়ী কর্মচারীর মাস মাইনে পাঁচ টাকা থেকে পঞ্চাশ টাকা। অর্থাৎ মাসের ৩০টি দিন কাজের পরে মসজিদের কোনও কর্মী হাতে পান ৫ টাকা, কেউ ৮ টাকা, কেউ ১৯ টাকা, কেউসর্বোচ্চ পান ৫০ টাকা। বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে টাকার অঙ্কগুলি কেমন অবাস্তব বা অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তব। আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হল, মোতিঝিল মসজিদের ১২ জন কর্মচারী তাদের মাস মাইনে পান ট্রেজারির মাধ্যমে লালবাগ বিডিও অফিস থেকে। সেখান থেকে মাইনে আনতেগাড়িভাড়ার খরচ অনেক বেশি।তাই কর্মীরা প্রতিমাসে না গিয়ে চার বা পাঁচ মাস অন্তর মাইনে তুলতে যান।
মুর্শিদাবাদ পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মোতিঝিল এলাকায় আড়াইশো বছরেরও বেশি প্রাচীন মোতিঝিল মসজিদটি রয়েছে। বাংলার নবাব আলিবর্দির জ্যেষ্ঠা কন্যা ঘসেটি বেগমের স্বামী তথা ঢাকার নবাব মহম্মদ নওয়াজেশ খান মোতিঝিল মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি লম্বায় ৮৫ ফুট এবং চওড়ায় ১২ ফুট। মসজিদের কাজকর্ম ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নবাব ১২ জন কর্মচারী নিযুক্ত করেন। শোনা যায়, নবাব মসজিদে নিযুক্ত কর্মচারীদের মাস মাইনে ১৯ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১৩ টাকার নির্ধারিত করেছিলেন। মসজিদ পরিচালনা সংক্রান্ত কাজকর্ম ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিজামত ট্রাস্ট নামে একটি ফান্ড গঠন করেন নবাব। এই নিজামত ট্রাস্ট ফান্ড থেকেই কর্মচারীদের বেতন ও মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খরচ করা হতো। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নতুন বেতন পরিকাঠামোয় কর্মচারীদের মাইনে বেড়ে হয় পাঁচ টাকা থেকে পঞ্চাশ টাকা। তখন থেকে ওই হারেই মসজিদের কর্মচারীরা মাস মাইনে পেয়ে আসছেন। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে স্থানীয় প্রশাসন থেকে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েও কোনও লাভ হয়নি বলে জানিয়েছেন মসজিদের কর্মচারীরা। পাঁচ টাকা মাস মাইনেতে সুইপারের কাজ করেন সামা বিবি। তিনি জানান, বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে পাঁচ টাকায় এক চাপ চা-ও পাওয়া যায় না। তবুও ভবিষ্যতে ভাগ্যের শিকে ছিঁড়বে এই আশায় কাজ করে চলেছি। মসজিদের বর্তমান সুপারভাইজার আরিফ হোসেন বলেন, নবাব মহম্মদ নওয়াজেশ খানের সময়ে নিযুক্ত কর্মচারীদের উত্তরসূরীরা বংশানুক্রমিকভাবে এই মসজিদে কাজ করে আসছেন। মাইনে বৃদ্ধির জন্য অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দরবার করা হয়েছিল। কোনও লাভ হয়নি। মাস শেষে যে টাকা পাই, সেটা দিয়ে একদিনের আনাজও কেনা হয় না। তাই সংসার চালাতে মসজিদের কাজের পাশাপাশি অন্য কাজ করতে হয়। ২০১২ সালে পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ মসজিদটি অধিগ্রহণ করলে মসজিদের ১২ জন কর্মচারী আশায় বুক বেঁধেছিলাম। এবারে আমাদের মন্দভাগ্য ঘুচবে। মসজিদ অধিগ্রহণ করলেও আমাদের দায়িত্ব না নেওয়ায় আমরা যে তিমিরে ছিলাম, সেইখানেই রয়েছি।