আমাদের বহু দলীয় গণতন্ত্র। সংসদীয় নির্বাচনে সমস্ত দলের প্রার্থীরা, এমনকি দলহীন বা নির্দল ব্যক্তিরাও যেকোনো আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। সেই হিসাবে লোকসভা এবং বিধানসভার মতো প্রধান দুটি নির্বাচনে প্রার্থী থাকেন রকমারি। তাঁদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে একজন করে প্রার্থী এমপি/ এমএলএ নির্বাচিত হন। নির্দিষ্ট সময়ে গঠিত হয় লোকসভা/ বিধানসভা। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র পেশ করা থেকেই নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুরু। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির প্রচারে ঝড় ওঠে রাজ্যজুড়ে, দেশজুড়ে। প্রচার থামতেই নেওয়া হয় ভোট। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ইতি পড়ে গণনার ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রার্থীরা সার্টিফিকেট হাতে পাওয়ার মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা দখল বা বদলের এ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। নির্বাচন, গণতন্ত্রের বৃহত্তম ‘উৎসব’ হলেও কোনো ‘নিরামিষ’ ব্যাপার নয়। পরিস্থিতি প্রতিমুহূর্তে উত্তেজক হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। তাই আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে স্বচ্ছতা নিরপেক্ষতার সঙ্গে ভোটগ্রহণ সবসময়ই একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। গণতন্ত্রের জন্য, আদর্শগতভাবে, এই চ্যালেঞ্জে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) জয় জরুরি। কিন্তু এই স্বশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিকাঠামো কিছু নেই। বিশেষত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ইসিআইকে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের উপরই নির্ভর করতে হয়। যেমন এবার নির্বাচনি নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগেই পশ্চিমবঙ্গে বিরাট কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। গোটা নির্বাচন পর্বে রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগ করা হবে বলেই খবর। কিন্তু এর পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া কেন্দ্রীয় বাহিনীর একার পক্ষে এত বড়ো নির্বাচন পর্ব উতরে যাওয়া সম্ভব নয়।
বিরোধীদের চোখে রাজ্য পুলিশ সবসময়ই ‘ভিলেন’। অন্যদিকে, ভোটের বাজারে বিরোধীরা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ‘ত্রাতা’র আসনে বসালেও তারাও ধোয়া তুলসীর পাতা নয়। বরং আধা সামরিক বাহিনী প্রতি ভোটেই নানা অভিযোগে বিদ্ধ হয়। মোদি জমানায় কারো কারো বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বারবার। মূল অভিযোগ তারা কেন্দ্রীয় শাসক দলের পক্ষ নিয়ে ভোটারদের মগজ ধোলাই করার চেষ্টা করে। এছাড়া, গরিব গ্রামবাসীর মুরগিটা-ছাগলটা তুলে নিয়ে যাওয়া, মহিলাদের যৌন হয়রানি করার মতো মারাত্মক অভিযোগও শোনা যায়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় থানা কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের বিরুদ্ধে এফআইআর নিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলার পুলিশের হাত-পা এবার নানাভাবে বেঁধে ফেলার কৌশল নিয়েছে কমিশন। কলকাতা এবং রাজ্য পুলিশের ছোটো বড়ো সমস্ত ধরনের কর্তাদের যেমন খুশি সরিয়ে বা বদলে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই থেমে না থেকে নতুন এক ফতোয়া জারি করে দিল ইসিআই—জওয়ানদের নামে অভিযোগ পেলেই এখন থেকে আর এফআইআর দায়ের করতে পারবে না পুলিশ। রাজ্যের সমস্ত ডিএম, এসপি এবং সিপিদের এক লিখিত নির্দেশিকায় সতর্ক করেছে নির্বাচন কমিশন। লিখিত একগুচ্ছ নির্দেশিকায় তারা সাফ জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কোনো জওয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে প্রথমে যথাযথ ‘এনকোয়ারি’ করতে হবে পুলিশকে। তাতে অভিযোগের সারবত্তা মিললে তবেই এফআইআর দায়ের করতে পারবে পুলিশ-প্রশাসন।
এনিয়ে স্বভাবতই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের মধ্যে। এটা হওয়ারই কথা। কেননা, কমিশনের এই নির্দেশিকা অবশ্যই একপেশে। নিছক হেনস্তার জন্য যাতে এফআইআর না-হয়, তাই একটা রক্ষাকবচ বিএনএস এবং বিএনএসএস-এ রয়েছে। এই রক্ষাকবচের অধিকারী কেন্দ্রীয় বাহিনী একা নয়, রাজ্য পুলিশও। তাহলে কেবল আধাসেনার জন্য পৃথক এমন নির্দেশিকা জারি কেন? তাদের বিরুদ্ধে ওঠা খুন-ধর্ষণের মতো অভিযোগের ক্ষেত্রেও কি এফআইআর করা যাবে না? তা কি আইনবিরুদ্ধ হবে না? বাংলায় অতীতে একাধিক ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর কীর্তি-কাহিনি রাজ্যবাসীর পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। সেসব ক্ষেত্রে এফআইআর করেই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলেছিল। এই যাদের কীর্তির ইতিবৃত্ত তাদের আচমকা একতরফা রক্ষাকবচ প্রদান অবশ্যই একদেশদর্শির্তা। বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের অভিযোগেই কমিশন সিলমোহর দিল না কি? বিজেপির নির্বাচনি প্রতীক ‘পদ্ম’ যুক্ত কমিশনের প্যাডও সামনে এসেছে! এবার সামনে এল তাদের পরিষ্কার একদেশদর্শী সিদ্ধান্ত। এছাড়া রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, বিভিন্ন শহরের সিপি, বিভিন্ন জেলার এসপি প্রভৃতি একতরফাভাবে পালটে দেওয়া হয়েছে আগেই। রাজ্যের মতামত উপেক্ষা করে একঝাঁক রিটার্নিং অফিসার অদলবদলের সিদ্ধান্তও সামনে এসেছে ইতিমধ্যে। সোজা কথায়, নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে নস্যাৎ করা হচ্ছে পদে পদে। পরোক্ষে গুরুত্ব ও মান্যতা পাচ্ছে কেবল প্রধানমন্ত্রীর দলের মতামত। এবার বাংলার নির্বাচনে ইসিআই যে ধারার প্রবর্তন করেছে, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে রক্ষাকবচ তার সঙ্গেই সাযুজ্যপূর্ণ। নির্বাচনে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে কমিশনের এই ভূমিকা নিন্দনীয়, বিষয়টি এখনই পুনর্বিবেচনা করা দরকার।