প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: ঝাড়গ্রাম বিখ্যাত শাল, মহুলের জঙ্গলের জন্য। অরণ্যের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পাহাড় বা ডুংরি। যা আসলে বড় বড় পাথরের স্তূপ। নববর্ষে জেলার বাসিন্দারা স্তূপ পাহাড়কে ফুল, গাছের পাতা দিয়ে পুজো করেন। জামবনীর মৌপাল জঙ্গলের ভিতর রয়েছে বিশাল স্তূপ পাহাড়। এই পাহাড়কে ঘিরে সন্ন্যাসী ও চিতাবাঘের অলৌকিক কাহিনি ছড়িয়ে আছে।
জামবনী মোড় থেকে ভালুকা পেরিয়ে জঙ্গলের পথে পড়ে মৌপাল ও রানিপাল গ্ৰাম। দু’টি গ্ৰামেই স্তূপ পাহাড় রয়েছে। পাথরের চাঁইগুলির আকৃতি গোলকার। জেলার অনান্য এলাকার পাহাড় বা ডুংরির চেয়ে এর ধরন আলাদা। স্তূপ পাহাড়ের কাছ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ডুলুং নদী। স্তূপ পাহাড় দু’টি বাইরের জগতের মানুষের কাছে এখনও প্রায় অজানা। চৈত্র সংক্রান্তির দিন রানিপালের স্তূপ পাহাড় থানে ডুংরি বুড়ির পুজো দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা ছাগ, মুরগি বলি দেন। মৌপাল স্তূপ পাহাড়ের গরাম থানে ফুল, পাতা দিয়ে লৌকিক প্রথায় পুজো দেওয়া হয়। জনশ্রুতি, জ্যোৎস্না রাতে স্তূপ পাহাড় থেকে এক সন্ন্যাসী চিতাবাঘ নিয়ে নেমে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দারা অবশ্য দূরদূরান্ত থেকে আসা কিছু মানুষকে স্তূপ পাহাড়ে বসে ধ্যান করতে দেখেছেন। স্তূপ পাহাড় ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয়। মৌপাল গ্ৰামের বাসিন্দা আশি বছরের দিজমণি বেরা বলেন, বনবিভাগে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। জঙ্গলএক আশ্চর্য জগত। বনের পশুপাখি ও জঙ্গল নিয়ে আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতা হয়েছে। স্থানীয় দু’-একজন বাসিন্দার মুখে শুনেছি, তাঁরা মধ্যরাতে স্তূপ পাহাড় থেকে এক সন্ন্যাসীকে চিতাবাঘ নিয়ে নেমে আসতে দেখেছেন। তবে এই পাহাড়ে এসে কিছু মানুষ ধ্যান করেন। আবার চলেও যান। আমরা তাঁদের বিরক্ত করি না। বাহিরগ্ৰামের বাসিন্দা কিরিটী রায় বলেন, চৈত্র সংক্রান্তির দিন রানিপালের স্তূপ পাহাড়ের থানে ডুংরি বুড়ির পুজো দেওয়া হয়। যাঁদের মানত পূরণ হয় তাঁরা ছাগ, মুরগি বলি দেন। নববর্ষের দিন সকালে মৌপাল গ্ৰামের স্তূপ পাহাড়ের থানে ফুল, পাতা দেওয়া হয়। বাড়ির মেয়েরা পরিবারের সদস্যদের মঙ্গল কামনা করে পুজো দেন। গ্ৰামবাসীরা স্তূপ পাহাড় দু’টিকে দেবতা হিসেবেই শ্রদ্ধা করেন। ঝাড়গ্ৰাম হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শিবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, জেলার পাহাড় ও অরণ্য দেখতে বহু পর্যটক আসেন। জামবনীর স্তূপ পাহাড় দু’টি তুলনায় উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। সমতল অরণ্যের ভিতর স্তূপ পাহাড় জেলায় খুব বেশি নেই। পাহাড় ঘিরে জনশ্রুতি, বিশ্বাস পর্যটকদের আকর্ষণ করবে বলেই মনে করি। ঝাড়গ্রাম পর্যটন দপ্তরের আধিকারিক বিধান ঘোষ বলেন, জামবনী ব্লকের মৌপাল ও রানিপালের স্তূপ পাহাড় দু'টি বৃহত্তর পর্যটকদের কাছে এখনও অপরিচিত। গুগল ম্যাপে জায়গাটির নাম ‘স্টোন হেঞ্জ’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। সেটা একদমই ঠিক নয়। জেলার পর্যটনের মানচিত্রে মৌপাল ও রানিপালের স্তূপ পাহাড় দু’টিকে আনার প্রক্রিয়া চলছে।