নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি ও সংবাদদাতা, বোলপুর: ‘তিন জনকে পায়ের তল দিয়ে পিষে মেরে দিয়েছি!’ ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটের প্রাক্কালে লাভপুরের তত্কালীন বিধায়ক মনিরুল ইসলামের এই ‘দম্ভোক্তি’ শোরগোল ফেলে দিয়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে। সাল বদলেছে, প্রতীকও বদলেছে, কিন্তু মনিরুলকে ঘিরে বিতর্কের ছায়া একবিন্দুও সরেনি। এক সময়ের তৃণমূলের ‘ব্রাত্য’ নেতা, জেল খাটা খুনের আসামি মনিরুলকেই এখন মাথায় তুলে নাচছে গেরুয়া শিবির। রবিবাসরীয় দুপুরেও দেখা গেল, লাভপুরের দাঁড়কা অঞ্চলে বিজেপি প্রার্থী দেবাশিস ওঝা ও মনিরুল একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে চুটিয়ে প্রচার করছেন। সেই প্রচারের মাঝেই বাসিন্দাদের মধ্যে চেনা গুঞ্জন-‘এই সেই মনিরুল না? তিন ভাইকে পিটিয়ে খুনের আসামি?’
শনিবার ফুল্লরা মেলার মাঠ থেকে সেই ক্ষতেই নুনের ছিটে দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সরাসরি বিজেপিকে হাড়িকাঠে চড়িয়ে তাঁর বিদ্রুপ, ‘এখানকার বিজেপি নেতা কে? মনিরুল ইসলাম! কী অবস্থা!’ স্থানীয় সূত্রের খবর, ২০১০ সালের ৪ জুন। মনিরুল তখন ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা। বালিঘাটের দখলদারি নিয়ে সালিশি সভা বসেছিল তাঁর বাড়ির উঠোনে। সেখানে উপস্থিত তিন সিপিএম সমর্থক ভাইকে পিটিয়ে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। সেই মামলায় গ্রেপ্তারও হন তিনি। পরে জামিন পেয়ে ফরওয়ার্ড ব্লক ছেড়ে অনুব্রত মণ্ডলের হাত ধরে তৃণমূলে গিয়েছিলেন। ২০১১ ও ২০১৬ সালে দু’-দু’বার জোড়াফুলের টিকিটে জিতে বিধায়কও হন। তবে, তারপর থেকেই দলে একপ্রকার কোণঠাসা হতে থাকেন মনিরুল। ২০১৯ সালে দল থেকে একপ্রকার বিতাড়িত হয়ে গেরুয়া শিবিরে আশ্রয় নেন। সেইসময় অবশ্য ‘দাগি’ মনিরুলকে দলে নিতে জেলা বিজেপির একাংশ বেঁকে বসে। কিন্তু এখন সেই মনিরুলকেই মাথায় তুলে লাভপুরের অলিগলি ঘুরছে বিজেপি।
রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, যাঁর বিরুদ্ধে খুন সহ একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে, যাঁর নাম শুনলে এখনো গ্রাম ভয়ে কুঁকড়ে যায়, সেই মনিরুলকে আঁকড়ে ধরে আদৌ কি লাভ হবে বিজেপির? বিশেষত, বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী অংশও মনিরুলের আকস্মিক আধিপত্যকে ভালোভাবে নিচ্ছে না। রাজনৈতিক মহলের মতে, মনিরুলের আগমনে লাভের চেয়ে লোকসানের পাল্লাই ভারি হতে পারে। এক হিন্দুত্ববাদী নেতার কথায়, কোন বাধ্যবাধকতায় মনিরুলকে মাথায় তুলে নাচতে হচ্ছে? আদর্শ বিসর্জন দিয়ে স্রেফ ভোটের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে আমরা কি আমাদের পুরানো কর্মীদেরই অপমান করছি না?
বিজেপির এক বিক্ষুব্ধ নেতার প্রশ্ন, ২০১৬ সালে তৃণমূলের টিকিটে লাভপুরে ১ লাখেরও বেশি ভোট পান মনিরুল। ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি নির্দলে দাঁড়িয়ে স্রেফ ১ হাজার ৯৯২ ভোট পেয়েছিলেন। নোটার চেয়েও কম! ওই নেতাকে নিয়ে যদি আমাদের প্রার্থী প্রচার করেন, তার ফল ভালো হবে তো? এই সুযোগে আক্রমণে শান দিতে ছাড়েননি অনুব্রত মণ্ডলও। তাঁর খোঁচা, মনিরুল লাভপুরে না এলেই ভালো করতেন, সম্মানটা থাকত। উনি আসায় আমাদেরই রাজনৈতিক সুবিধা হল। এদিকে, লাভপুরের তৃণমূল প্রার্থী অভিজিৎ সিংহও আমজনতাকে সাবধান করে শুনিয়েছেন, শান্ত লাভপুরকে অশান্ত করার লোক চলে এসেছে। যদিও মনিরুলের দাবি, আমাকে চারটে খুনের মামলার আসামি করেছে। সাতটা মিথ্যা মামলা দিয়েছে। এসবের ব্যাখ্যা পরে একদিন দেব। -নিজস্ব চিত্র