শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: অভিযুক্ত চুরির মামলায় সাজা খাটছিল প্রেসিডেন্সি জেলে। সেখানে বিভিন্ন পদমযার্দার নীচুতলার পুলিশ কর্মীরা আসতেন অভিযুক্তদের ছাড়তে বা নিয়ে যেতে। সেই সুবাদে তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়েছিল সাজাপ্রাপ্ত বন্দি পলাশ কুমার মণ্ডল। কোন আইপিএস অফিসার কোন পদে রয়েছেন, গল্পের ছলে জেনে নিত তাও। জেলের কুঠুরি থেকে বিভিন্ন আইপিএস অফিসারের গলা নকল করে ফোনে জানাত, টাকা দিলেই মনের মতো পোস্টিং মিলবে। পোস্টিং বাবদ কয়েকজনের কাছ থেকে নিয়েছিল টাকাও। অভিযুক্তের এই ‘কীর্তি’ জানাই যেত না, যদি না সাজা খেটে বাইরে এসে ফের অপরাধ করে পুলিশের হাতে ধরা পড়ত। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্তা পরিচয়ে টাকা তোলার ঘটনায় আলাদা আলাদা কেস রুজু হয়েছে বারাকপুর ও শিলিগুড়ি কমিশনারেটে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পলাশ বিভিন্ন জায়গায় চুরি করে বেড়াত। চুরির অভিযোগে তার বেশ কয়েকবছর সাজাও হয়। প্রেসিডেন্সি জেলেও ছিল। ছাড়া পেয়ে বাইরে এসে পলাশ বেশ কিছু ধর্মীয় মঠে চুরি করে বেড়ায়। চেতলার এক মঠে চুরির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে লালবাজার। এরপরই তার একের পর এক কাহিনী ফাঁস হতে শুরু করে। অভিযুক্ত জানায়, জেলে থাকাকালীন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে সংশোধনাগারের অফিসে বিভিন্ন ফাইফরমাশ খাটত। এখানেই আসতেন সাব ইনস্পেক্টর, এএসআই এবং কনস্টেবলরা। অভিযুক্তকে নিয়ে যাওয়া বা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কাজে তাঁদের সহযোগিতা করত অভিযুক্ত। সেই সুবাদে বেশ কিছু কনস্টেবল ও এএসআইয়ের সঙ্গে তার ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কথা প্রসঙ্গে জেনে নেয়, তাঁদের ভালো পোস্টিং দরকার। অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছেন। কিন্তু ‘সাহেব’দের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় কোনও লাভ হচ্ছে না। কোন সাহেব কোথায় রয়েছেন, এই পর্বেই জেনে নেয় সে। অভিযুক্ত পলাশ তদন্তকারীদের জানিয়েছে, এরপর সে মতলব আঁটে বিভিন্ন আইপিএসদের নাম করে ওই সমস্ত এএসআই-কনস্টেবলদের ফোন করার। ততদিনে রাজ্য পুলিশের বেশ কিছু পদস্থ কর্তার নাম মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল তার। তাঁদের নাম করে এক এএসআই ও এক কনস্টেবলকে ফোন করে পলাশ জানায়, ভালো জায়গায় পোস্টিং হয়ে যাবে। কিন্তু এরজন্য টাকা লাগবে। জেরায় অভিযুক্ত জানিয়েছে, পোস্টিং টোপ দেওয়ার এ কাজে জেলের এক ওয়ার্ডেনের মাধ্যমে মেলা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেছিল। দুই পুলিশ কর্মী টাকা দিতে রাজি হন। এএসআইকে ৫০ হাজার ও কনস্টেবলকে ৩৫ হাজার টাকা পাঠানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নম্বর দেয় পলাশ। সেইমতো তাঁরা টাকাও পাঠিয়ে দেন। টাকা দিয়েও পছন্দমতো পোস্টিং না পেয়ে হতাশ হন তাঁরা। বাধ্য হয়ে ‘সাহেব’ পরিচয় দিয়ে আসা মোবাইল নম্বরটি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন তাঁরা। মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাঁরা বুঝতে পারেন, প্রতারিত হয়েছেন। কিন্তু কে এর নেপথ্যে, না জানায়, কোনো পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছিল না। মঠের চুরিতে পলাশ ধরা পড়তেই এই ‘কীর্তি’ সামনে এসেছে। জানা গিয়েছে এই টাকা সে জেলের এক ওয়ার্ডেনের অ্যাকউেন্টে নিয়েছিল। অভিযুক্ত জানিয়েছে, জেলে বসে এভাবে টাকা তোলার একটা সিন্ডিকেট সে চালাচ্ছিল।