সম্প্রতি শীর্ষ আদালতের রায়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৬ হাজার স্কুল শিক্ষকের চাকরি খারিজ হয়ে গিয়েছে। এনিয়ে দেশজুড়ে বিস্ময় এবং সমালোচনার অন্ত নেই। কিন্তু তারই আগে ভারতীয় কর্মক্ষেত্রে নীরবে ঘটে গিয়েছে আরও বড় বিপর্যয়। গত মার্চে বা ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের শেষ মাসে দেশের নানা কর্মক্ষেত্রে ৪২ লক্ষ শ্রমিক কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। মাত্র একমাসের ভিতরে ৪২ লক্ষ মানুষের চাকরি চলে যাওয়ার বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমির (সিএমআইই) রিপোর্ট অনুসারে, দেশে ‘লেবার ফোর্স’ নিম্নমুখী। অর্থাৎ কর্মরত লোকজনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে এমন নরনারীর সংখ্যা ছিল ৪৫.৭৭ কোটি। সংখ্যাটি মার্চে কমে হয়েছে ৪৫.৩৫ কোটি। সোজা কথায়, একমাসের তফাতে ৪২ লক্ষ ভারতীয় শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। সমীক্ষক সংস্থার বক্তব্য, বারবার খালি হাতে ফিরতে ফিরতে চাকরির চেষ্টা করাতেই ক্ষান্ত দিয়েছেন একদা কর্মপ্রার্থী লক্ষ লক্ষ মানুষ। ২০২৪ সালের তুলনায় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় নিয়োগের হারও প্রায় দেড় শতাংশ কমেছে। পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটির রিপোর্ট অনুসারে, আইআইটিগুলিতেও প্লেসমেন্টের হার কমেছে ১০ শতাংশ।
এমএসএমই দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং জানাচ্ছেন, গত পাঁচ বছরে ৭৫ হাজারের বেশি এমএসএমই শিল্প-ব্যবসা সংস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ করোনাকালের আঘাত এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশ। চাকরি দেবে, ধরে রাখবে যেসব সংস্থা সেগুলিতেই লালবাতি জ্বলে গেলে চাকরি হবে কোথা থেকে? এটাই মূল প্রশ্ন। বছরে ২ কোটি নতুন চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সামনে রেখেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। এই নিয়ে দেশে চলছে তাঁরই তৃতীয় দফার সরকার। কিন্তু চাকরি দেওয়া দূর, সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের কেষ্টবিষ্টুরা উচ্চবাচ্য পর্যন্ত করেন না। করোনা পর্ব মিটতেই দেশের মাননীয় অর্থনীতিবিদরা এমএসএমই-সহ কাজের বাজার চাঙ্গা করার জন্য একাধিক পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু মোদি সরকার যথারীতি তাতে কর্ণপাত করেনি, নীরবতা বজায় রেখে এটাই বুঝিয়ে দিয়েছিল যে—‘সব ঠিক হ্যায়’! কিন্তু কিছুই যে ঠিক নেই, বরং বেকারত্বের সমস্যাই রোজ জটিলতর আকার নিচ্ছে মোদির ‘বিকশিত’ ভারতে পরিষ্কার হচ্ছে সেটাই।
অন্যদিকে, ভারতের শ্রম বাজারে বিরাট বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে ‘ইন্ডাস ভ্যালি রিপোর্ট ২০২৫’-এও। ব্লুম ভেঞ্চারসের প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ নিয়মিত বেতন পান, যাঁদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশের রয়েছে কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা নিয়োগপত্র। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গিয়েছে, রাশিয়ায় ৯৩ শতাংশ, ব্রাজিলে ৬৮ শতাংশ, চীনে ৫২ শতাংশ এবং বাংলাদেশেও ৪২ শতাংশ কর্মী ‘অফিসিয়ালি’ নিযুক্ত। ভারতের ১৩ শতাংশ মানুষ নিয়মিত বেতন পেলেও তাঁদের চাকরির কোনোরকম সুরক্ষা নেই। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার অত্যন্ত বেশি, প্রায় ২৯ শতাংশ। আমেদাবাদের এক কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষার্থীরা ফিল্ডওয়ার্ক করতে চান না, তাঁরা চান কর্পোরেট অফিস, ল্যাপটপ এবং প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতন। তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশের লক্ষ্য ‘সরকারি’ বা ‘এসি’ চাকরি। ভারতে সরকারি চাকরির সংখ্যা সীমিত হলেও এগুলোর বেতন বেসরকারি খাতের তুলনায় অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের বেতন বেসরকারি শিক্ষকদের তুলনায় ৬-৭ গুণ বেশি। অথচ, সরকারি চাকরি প্রার্থী সংখ্যা ব্যাপক। যেমন—ইউপি পুলিসের ৬০ হাজার পদের জন্য প্রার্থী ৫০ লক্ষ। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভারত পিছিয়ে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯৬ শতাংশ কর্মী প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলেও সংখ্যাটি ভারতের ক্ষেত্রে মাত্র ২.৩! ব্যাপারটি উৎপাদন শিল্পের জন্য প্রতিকূল। এমন পরিস্থিতিতে মূলধন নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। রিপোর্টটি আরও জানায়, ভারত একটি দেশ নয়, বরং তিনটি ভিন্ন দেশের সমষ্টি—‘ইন্ডিয়া ১’, ‘ইন্ডিয়া ২’, এবং ‘ইন্ডিয়া ৩’। এই ‘ইন্ডিয়া ৩’-এর ১০০ কোটি মানুষ মাসে মাত্র ৮ হাজার টাকায় বেঁচে আছেন। এই ছবি প্রধানমন্ত্রীর ‘সবকা বিকাশ’ এবং ‘বিকশিত ভারত’ স্লোগানের বিপরীত সাক্ষ্যই দেয়। এই ‘করুণ কীর্তি’ স্থাপনের জন্যই কি ভারতবাসী ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় এনেছিল এবং তাঁকে হ্যাটট্রিকের দুর্লভ সুযোগ দিয়েছে? প্রতিটি ভারতবাসী আজ এই একটি প্রশ্নই করুক, অন্য কাউকে নয়, নিজেকে।