Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মোদির ভারত তবু ভালো আছে!

মোদির ভারত তবু ভালো আছে!
  • ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০২
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: আচ্ছে দিনের এক দশক, নোট বাতিলের ৯। কেমন আছে নরেন্দ্র মোদির ভারত? ১৪২ কোটি জনগণের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে। অথচ তিনি ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন। এমনকী, বাজেট অধিবেশনের মধ্যেও এ মহাদেশ থেকে অন্যত্র, উপদেশ পরামর্শ দিয়ে চলেছেন অবিরত। কিন্তু তাঁর নিজের দেশের অবস্থা? বেকাররা কাজ পাচ্ছেন না। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য কেনাকাটা অনিশ্চয়তায় ভরা! 

Advertisement

তবু ভক্তকুল কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে বলছে, ‘সব 
ঠিক হ্যায়’! এই তো দেখুন না ওয়াকফ সংশোধনী বিল আইনে পরিণত হয়েছে। তিন তালাক রদের পর মুসলিম মহিলাদের আর এক কিস্তি উপহার। আরএসএস-বিজেপির বাকি এজেন্ডা বলতে, ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ আর ‘এক দেশ এক 
নির্বাচন’। ভেবে দেখুন, প্রতিটি প্রস্তাবিত আইনই বিভাজনের মোক্ষম অস্ত্র আর হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের দাওয়াই। সমাজ ভাঙতে ভাঙতে ছোট ছোট দ্বীপ! ওখানে হিন্দু থাকে, এপারে মুসলিম। ধর্মের পাঁচিলের আড়ালে দুয়ের ঘরেই কিন্তু বেকারত্বের জ্বালা এক! জিডিপি’র পতনও ধর্ম মানে না। তবু ভগ্ন হৃদয়ে কাঁপা গলায় বলতেই হবে ‘ভালো আছি’? এর নামই জুমলা!
বেকার ক্ষুধাক্লিষ্ট মানুষ কি ধর্ম বোঝে? কিংবা যার মাথায় ছাদ নেই। আশ্রয়হীন! যার ব্যবসা থেমে গিয়েছে নোট বাতিল আর জিএসটি’র গোলকধাঁধায়। শিক্ষার আলো যে ঘরে পৌঁছতে ব্যর্থ। সে শুধু সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে প্রিয়জনের বিয়োগে কাঁদে। আর শহুরে শিক্ষিত ইএমআই-জীবীরা? স্বল্প সময়ে দ্বিতীয় বার সুদের হার (পড়ুন রেপো!) ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমাতে গিয়ে এক অন্ধকার অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। একদিকে মন্দার হাতছানি, বিপরীতে মূল্যবৃদ্ধির অশনিসঙ্কেত! দুইয়ের ত্র্যহস্পর্শে অর্থনীতি টালমাটাল। দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্কের অকপট স্বীকারোক্তি, এত কিছু করেও দাম কমানোর দাওয়াই কম পড়িয়াছে। বরং আমেরিকার চাপানো বিশ্বব্যাপী শুল্ক-যুদ্ধ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীকে সামনের দিনে আরও মহার্ঘ করে তুলতে বাধ্য। শুধুই দামের ছেঁকা নয়, বাজার থেকে উবে গিয়েছে সরকারি চাকরিও। গত দশ বছরে বারবার বিপুল শূন্যপদের খতিয়ান দেখতে দেখতেই চুলে হালকা পাক ধরে গিয়েছে যুবক-যুবতীর। বছরে দু’কোটি চাকরির নাটকে চোনা পড়ে গিয়েছে অনেক আগেই। সামান্য চাকরিও আর জোটে না। বাজেটে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত যেসব প্রকল্প ইতিমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে, তাও একপ্রকার ফ্লপ। পুরোদস্তুর সেনার চাকরি বদলে গিয়েছে ‘ফ্লপ’ অগ্নিবীরের আড়ালে। অর্থমন্ত্রীর মহার্ঘ শাড়ির মতো নিয়োগ সংক্রান্ত আশ্বাসটুকুও তোলা থাকে বাজেটের জন্যই। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দূরবর্তী গঞ্জ-শহরে আজ অর্থনীতির চালিকাশক্তি একশো দিনের কাজ প্রকল্পেও বরাদ্দ কমানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজের যাবতীয় অর্থ বরাদ্দ বন্ধ টানা তিনবছর। সোজা কথায়, সাধারণ মানুষকে নিয়ে হেলদোলই নেই মোদি সরকারের। ধর্ম, বিভাজন আর এক সম্প্রদায়কে অন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিতে পারলেই যে গদি সুরক্ষিত, তা বুঝে গিয়েছে শাসকরা।
আপাতত ছ’মাস ভোটের ছুটি। বছরের শেষে নভেম্বরে বিহারে ভোট। তারপর ছাব্বিশে বাংলার মহারণ। কোনও কড়া পদক্ষেপ নিলেও ততদিনে মানুষের গা-সওয়া হয়ে যাবে! এতেই পোয়াবারো কেন্দ্রের সরকারের। বিনা বাক্যব্যয়ে গৃহস্থের হেঁশেলে আগুন দিয়ে রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে গেল ৫০ টাকা। পাল্লা দিয়ে চড়ল উজ্জ্বলা যোজনার সিলিন্ডারের দামও। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল পিছু ৬০ ডলারে নেমে এসেছে। অথচ তার কোনও লাভ মধ্যবিত্তকে না দিয়ে শুল্ক বাড়িয়ে প্রায় ৩২ হাজার কোটির মুনাফা নিশ্চিত করা হল। আমেরিকা পাল্টা শুল্ক চাপালে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কিন্তু আমাদের ‘আচ্ছে দিন’-এর সরকার তো দেশের মানুষকে এতটুকু ছাড়তে নারাজ। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যখন অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা বলে সতর্ক করছে, তখনও নয়! 
২০ জানুয়ারি ট্রাম্প শপথ নিতেই দেশজুড়ে একটা ‘ফিল গুড’ হাওয়া ছড়িয়ে দিয়েছিল আগমার্কা স্বদেশপ্রেমী গেরুয়াবাহিনী! ভাবটা এমন যেন ‘বন্ধু’ মোদির পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান করবেন মুশকিল আসান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বহুমূল্য অস্ত্র দেবেন। দিল্লির শত্রু পাকিস্তান ও চীনকে সমঝে দেবেন। বাংলাদেশে হাসিনাকে ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু মোদিজির ঝটিকা সফরের তিনমাস পর স্পষ্ট, স্বার্থ ছাড়া কারও পাশেই দাঁড়ায় না আমেরিকা। তাই বাংলাদেশের হিন্দু নিধন নিয়ে একটা হুঙ্কারও আর শোনা যায়নি হোয়াইট হাউস থেকে। উল্টে মোটা টাকার অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে ‘বাধ্য’ মোদি সরকারই। আমাদের উপর শুল্কও কম চাপেনি। তবে লড়াইটা আপাতত চীনের সঙ্গে বলে বর্ধিত শুল্ক স্থগিত করে তিনমাস নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে মাত্র। কিন্তু আমেরিকার এই পাল্টা শুল্ক চাপানোর ধাক্কায় বড় মাপের মন্দা গ্রাস করতে চলেছে আমাদের (থুড়ি, গরিব মানুষকে)। আশঙ্কা একটাই—চীন ও আমেরিকার এই ছদ্ম যুদ্ধে আমাদের না শেষে উলুখাগড়া হয়ে প্রাণ হারাতে হয়! পাকিস্তানকে ‘এফ ১৬’ যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণে সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলারের সুবিধা দিয়েছে ওয়াশিংটন। আর ভারতের উপর ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ চেপেছে ২৬ শতাংশ। রহস্যজনকভাবে পাঁচটা দেশকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় মেক্সিকো, ডেনমার্কের সঙ্গে পুতিনের রাশিয়া থাকলেও ‘বন্ধু’ মোদির ভারত নেই! তাহলে গুরুত্বপূর্ণ বাজেট অধিবেশনের মধ্যেই হোয়াইট হাউসে ছুটে যাওয়া কেন? কেনই-বা হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে রক্তচক্ষু সহ্য করা, ‘আমি তর্ক পছন্দ করি না।’ বন্ধু বলে দিল্লি বাড়তি কোনও সুবিধা আদায় করতে পেরেছে কি? মোদিজির অতি বড় সমর্থকও কিন্তু আজ একথা বিশ্বাস করবে না।
নিশ্চয়ই সান্ত্বনা পুরস্কার একটা মিলেছে। ২৬/১১ হামলার অন্যতম চক্রী তাহাউর রানাকে ফেরানো সম্ভব হয়েছে মার্কিন অনুগ্রহেই। ভারতের মাটিতে পাকিস্তানের সন্ত্রাস ছড়ানোর চক্রান্ত এর ফলে বেআব্রু হবে। কিন্তু তাতে কি জঙ্গি কার্যকলাপ বন্ধ হবে? ২০১৩ সালে রানাকে ১৪ বছর কারাদণ্ডের সাজা দেয় আমেরিকার আদালত। ২০২০ সালে স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে তাকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। সেই থেকেই ভারত তাকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ১৬ মে রানাকে প্রত্যর্পণের নির্দেশ দেয় ক্যালিফোর্নিয়ার জেলা আদালত। পাল্টা আবেদন জানায় সে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সুপ্রিম কোর্টেও স্বস্তি মেলেনি। গত বছরের আগস্ট মাসে ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালত জানিয়ে দেয়, রানা ভারতে প্রত্যর্পণযোগ্য। পাকিস্তানি সেনার প্রাক্তন কর্মীর আবেদন ধোপে টেকেনি। গত বৃহস্পতিবার সেই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের হাঁটু কাঁপলেও ভারতের মাটিতে নাশকতা কি বন্ধ হবে? এক কথায় উত্তর, ‘না’। জঙ্গিমুক্ত কাশ্মীর সোনার পাথরবাটি হয়েই থেকে যাবে। উপত্যকার রক্তপাত বন্ধ হবে না।
আমাদের বিরোধীদের অবস্থা দেখুন। ভোট না থাকলে ঘন ঘন ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের ধুম পড়ে যায়। কিন্তু ভোট যখন দুয়ারে তখন আর কেউ কাউকে চিনতে পারে না। আসন সমঝোতা, ঐক্যবদ্ধ প্রচারের রূপরেখা চূড়ান্ত করা, একসঙ্গে বসে প্রার্থী ঠিক করা কিছুই হয়ে ওঠে না। তখন সবাই সবার শত্রু। পরোক্ষে বিজেপিরই লাভ। এটাই আজকের রাজনীতিতে মোদিজির সবচেয়ে বড় শক্তি। তার চেয়েও বড় অস্ত্র রাহুল-প্রিয়াঙ্কার খামখেয়ালি রাজনীতির বিশুদ্ধ অক্সিজেন! বছর শেষে একটাই নির্বাচন বিহারের। ওই রাজ্যে কংগ্রেসের অবস্থা বাংলার চেয়েও করুণ! আমেদাবাদে সবরমতীর তীরে এতবড় এআইসিসি সম্মেলন হল। তার আগে রাহুল গান্ধী দিব্যি পাটনা ঘুরে গেলেন। বলি, কোনও লাভ হয়েছে? আরজেডির সঙ্গে আগেভাগে একটা রফা করে সম্মিলিত প্রচারের ব্লুপ্রিন্ট কি তৈরি হয়েছে? হয়নি। ভোট পেরিয়ে গেলেও হবে না। সবরমতীর তীরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরাও অষ্টপ্রহর রাহুল, সোনিয়া ও প্রিয়াঙ্কার প্রশস্তি আর মোদি-অমিত শাহের একঘেয়ে সমালোচনা শুনতে শুনতে ক্লান্ত। ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও দিগ্‌নির্দেশ অধরাই। 
মানুষের সমস্যা যখন গলায় চেপে বসে তখন রাষ্ট্রনায়করা মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে ইস্যু তৈরি করেন। শুল্ক বিক্ষোভে ত্রস্ত আমেরিকায় কল থেকে ধীর গতিতে জল পড়া নিয়ে দীর্ঘদিন সরব ছিলেন ট্রাম্প। শুল্ক-যুদ্ধ-পরিস্থিতির মধ্যেই সেই ‘সমস্যা’ দূর করতে উদ্যোগী হলেন তিনি। গত সপ্তাহেই ওই সংক্রান্ত এগজিকিউটিভ অর্ডারে সই করেছেন তিনি। এই পদক্ষেপ করে ট্রাম্পের আহ্বান—‘মেক আমেরিকাস শাওয়ার গ্রেট এগেইন’। সেই সঙ্গে ‘চুলের যত্ন’ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। শাওয়ারের জলের চাপ কম থাকা নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ব্যাপারেই বলি। আমার সুন্দর চুলের যত্ন নেওয়ার জন্য সুন্দরভাবে স্নান করতে পছন্দ করি। চুল ভেজানোর জন্য ১৫ মিনিট শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে, খুবই হাস্যকর।’ বিধিনিষেধেরই অবলুপ্তি ঘটিয়ে ট্রাম্পের পরামর্শ, ‘চুলের যত্ন নিন।’ পাল্টা মোদিজি কী বলবেন? চাকরি চাইবেন না স্টার্ট আপ খুলুন! ত্বকের যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার মানুষ নন তিনি। তাই কখনও নোট বাতিল। কখনও তিন তালাক রদ, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, ওয়াকফ সংশোধনী—মোদিজির চমকের অভাব নেই। আসন্ন মন্দা, রেকর্ড বেকারত্ব এবং রান্নার গ্যাসের দামবৃদ্ধির ‘সাইড এফেক্ট’ সামলাতে নরেন্দ্র মোদির তূণে বিভাজন ছাড়া চমকের আর কী অস্ত্রই-বা আছে? 
হিসেব না মিললেও নাগপুরের গেরুয়া শিবির সোচ্চারে বলবে, এমন অভূতপূর্ব উন্নয়ন কোনওকালে হয়নি। ‘সবকা বিকাশ’ অধরাই থেকে যায়। রাজনীতির মেকি স্লোগানে গরিবের পেট ভরে না। কৃষকের আয় দ্বিগুণের স্বপ্নও ফিকে। পাঁচ ট্রিলিয়ন অর্থনীতি খায় না মাথায় দেয় গরিব বোঝে না। সামান্য কয়েকজনের ঘরে দেশের সম্পদ বোঝাই হয়। তবু ভোট এলেই সাফল্যের হরেক কিসিমের প্রদর্শনী বসিয়ে সাফল্যের মার্কেটিং শুরু হয়। কিন্তু বাজারি স্নো পাউডার মাখিয়ে কতদিন আর কঙ্কাল শরীর ঢেকে দেওয়া যায়! আচ্ছে দিনের মলিন বসন্তে টাকার মূল্য যেমন কমছে, পাল্লা দিয়ে পড়ছে মানুষের দামও! প্রমাণ হচ্ছে, কোনও শাসকই কথা রাখে না। মোদিও না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ