বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’ বোধ হয় একেই বলে! বিস্তর ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মঞ্চ থেকে ‘জিএসটি বিপ্লব’ ঘোষণা করেছিলেন! সেই মতো গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কেন্দ্র বিভিন্ন পণ্যের উপর জিএসটি কমিয়েছে বা নয়া হার আরোপ করেছে। সরকার ও কেন্দ্রের শাসক দলের তরফে দেশজুড়ে প্রচার করা হয়, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধিতে নাজেহাল দেশবাসীকে স্বস্তি দেবে এই পদক্ষেপ। তাছাড়া, করের বোঝা কমলে মানুষ বেশি কেনাকাটা করবে। ফলে চাঙ্গা থাকবে দেশের অর্থনীতিও। ক’মাস পর দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের যে সুরাহা হয়েছে, তা নামমাত্র। গ্রাম ও শহরের মানুষের গড় মাসিক খরচের উপর জিএসটির নয়া হারের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মানুষের খরচ কমেছে মাসে মাত্র ৩৪ টাকা। শহরের ক্ষেত্রে তা ৬০ টাকারও কিছু কম। কোনও বেসরকারি সংস্থার দাবি নয়, খোদ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের আওতাধীন ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি’র রিপোর্টে উঠে এসেছে এই তথ্য। গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে তাদের রিপোর্ট। সেখানে কেন্দ্রীয় সংস্থাটি জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের উপর থেকে জিএসটির দায় কমেছে মাত্র ১ শতাংশ! সামগ্রিকভাবে যেখানে তাদের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পণ্য ও পরিষেবা কর মেটাতে হত, এখন তা ৪ থেকে ৬ শতাংশ হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবর্ষের ‘ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে’ থেকে তথ্য নিয়ে এই হিসেব কষা হয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী গ্রামীণ এলাকার মানুষ মাসে মাথা পিছু গড়ে ৩ হাজার ৪০০ টাকা খরচ করেন। শহর এলাকায় তা ৫ হাজার ৭৫৭ টাকা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিটি জিএসটি স্ল্যাবের আওতায় ক্রেতারা যেভাবে খরচ করতেন, বর্তমান স্ল্যাবে তার পরিবর্তন হয়েছে। যেমন, জিএসটি নেই, এমন পণ্য কিনতে আগে গ্রামের ক্রেতারা গড়ে ৮৯৭ টাকা খরচ করতেন। জিএসটির নয়া হার ঘোষণার পর তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২১০ টাকা। বহু পণ্যের করের বোঝা ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। তাই ৫ শতাংশ স্ল্যাবের আওতায় মাসিক খরচ ৫৩৩ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮১৭ টাকা। যেসব পণ্যের উপর পাঁচের উপর থেকে ১৮ শতাংশের কম জিএসটির হার প্রযোজ্য ছিল, সেই খরচ বর্তমানে নেই। কারণ, ১২ শতাংশের স্ল্যাব তুলে দেওয়া হয়েছে। ১৮ শতাংশ জিএসটির হার প্রযোজ্য ছিল যে পণ্যগুলির উপর, সেগুলির জন্য ক্রেতারা মাসে গড়ে ৫১২টাকা খরচ করতেন। যা এখন কমে হয়েছে ৩৭৮ টাকা। প্রসঙ্গত, বর্তমানে বেশিরভাগ পণ্যের উপর জিএসটির হার চালু রয়েছে ৫, ১৮ এবং ৪০ শতাংশ হারে। আগে তা ছিল ৫, ১২, ১৮ এবং ২৮ শতাংশ হারে। ২৮ শতাংশের উপর চাপানো হতো সেস, যা কখনও কখনও করের বোঝা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে দিত। এই অবস্থায় করের নয়া হার লাগু হলেও মানুষের উল্লেখযোগ্য কোনও সুবিধা হয়নি। অর্থাৎ, মূল্যবৃদ্ধির আঁচে পুড়তে থাকা আম জনতাকে ‘উদ্ধার’ করার যে প্রচার গেরুয়া শিবির চালিয়েছিল, বাস্তবের মাটিতে তার তেমন কোনও প্রভাব খুঁজে পেল না কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থাই।