Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মোদির নজরে দুই বাংলা

ছাব্বিশে নরেন্দ্র মোদির নজর মূলত বাংলার দিকে। জোড়া বাংলা। এপার, ওপার দু’পার বাংলা। ওপারে জাতীয় সংসদের নির্বাচন (অবশ্য শেষমেশ যদি হয়ে ওঠে) মিটতে না মিটতেই এপারে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী চান বাংলাদেশে কূটনৈতিক জয় এবং নির্বাচনী বিজয় পশ্চিমবঙ্গে।

মোদির নজরে দুই বাংলা
  • ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: ছাব্বিশে নরেন্দ্র মোদির নজর মূলত বাংলার দিকে। জোড়া বাংলা। এপার, ওপার দু’পার বাংলা। ওপারে জাতীয় সংসদের নির্বাচন (অবশ্য শেষমেশ যদি হয়ে ওঠে) মিটতে না মিটতেই এপারে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী চান বাংলাদেশে কূটনৈতিক জয় এবং নির্বাচনী বিজয় পশ্চিমবঙ্গে। 

Advertisement

***
বেগম খালেদা জিয়ার অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রীর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মহম্মদ ইসহাক দার তাঁর ঢাকা সফর বাতিল করেন। ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সমস্ত সংবাদপত্র এবং টিভি নিউজের প্রধান খবর ছিল, সেদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে যোগ দিতে ঢাকা যাচ্ছেন পড়শি রাষ্ট্রগুলির প্রথম সারির প্রতিনিধিরা। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভারত এবং পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীদ্বয়। ওইদিন ইসহাক দারের উপস্থিতি ‘কনফার্ম’ করে ঢাকায় অবস্থিত পাক হাইকমিশন। পরদিন, ৩১ ডিসেম্বরই স্বামী ‘শহিদ’ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই খালেদা জিয়াকে দাফন করা হয়। কিন্তু সেখানে গরহাজির ইসহাক দার! পরিবর্তে আনুষ্ঠানিকতা সারলেন পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক। 
অন্যদিকে, ওই অনুষ্ঠানে পূর্ব ঘোষণামতোই পৌঁছে যান এস জয়শংকর, ভারতের বিদেশমন্ত্রী। ইসহাক দার কি জয়শংকরকে এড়ালেন? এই প্রশ্নেই গুঞ্জন চলে ঢাকায়। সাদিকের সঙ্গে করমর্দন করেন জয়শংকর। তবে বাংলাদেশের বর্তমান শাসক মহম্মদ ইউনুসের সঙ্গে কোনওরকম সাক্ষাৎ হয়নি মোদির প্রতিনিধির। ইউনুস সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মহম্মদ তৌহিদ হোসেন, তার আগে হাজার চেষ্টাতেও জয়শংকরের সাক্ষাৎ পাননি। সেখানে খালেদার অন্ত্যেষ্টিতে জয়শংকর ঢাকা পৌঁছে গিয়েছেন একটি সামরিক বিমানে চেপে। আমরা জানি, হাসিনা সরকারের পতনের পর পাকিস্তান-বাংলাদেশ কতখানি কাছাকাছি চলে এসেছে। পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্তারা ঢাকা সফর করে চলেছেন ঘন ঘন। বস্তুত ১৯৭১ সালের পরে বাংলাদেশে পাকিস্তানের এমন ‘অনুপ্রবেশ’ এই প্রথম। তারা ইউনুসের সঙ্গে দহরম মহরম বাড়ালেও বিএনপি বা খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অন্তত প্রকাশ্যে এই লেভেলের ছিল না। কারণ শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামি লিগই নয়, বিএনপির প্রাণপুরুষ জিয়াউর রহমানও স্বাধীনতার পক্ষের ব্যক্তিত্ব। ওই পরিচয়ে জিয়া বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায়ও ছিলেন। তাঁর অবর্তমানে উত্তরসূরি হিসেবে খালেদা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিন দফায়। কিন্তু এই দম্পতির আমলেও ঢাকায় ঢোকার অবাধ ছাড়পত্র পায়নি ইসলামাবাদ।
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে। এই নির্বাচনে ইউনুস অ্যান্ড কোম্পানি শেখ হাসিনার পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অতএব আগামী নির্বাচনে ওপার বাংলায় জিয়া-খালেদার পুত্র তারেক রহমানের সরকার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। শুধু হাসিনা নয়, ঢাকায় তারেকের সরকারকেও হজম করা আসিম মুনির এবং শাহবাজ শরিফের পক্ষে কঠিন ব্যাপার। বলা বাহুল্য, খালেদা জিয়ার সরকারও ভারতের সঙ্গে ন্যূনতম ব্যালান্স করার চেষ্টা করত। হিন্দুসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন, তাদের সঙ্গে বৈষম্যের নীতি নিয়ে সমালোচনা হলেও দুই দেশের সম্পর্ক এমন তলানিতে সেসময় যায়নি। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সেই ‘ঐতিহ্য’ স্মরণে রেখে খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় ‘বিচলিত’ হয়েছেন মোদি। আরোগ্য কামনার পাশাপাশি তাঁর চিকিৎসায় পাশে থাকারও বার্তা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এবার সরাসরি মোদির প্রতিনিধি হয়ে ঢাকা গিয়েছেন জয়শংকর। এমনকী, প্রধানমন্ত্রীর লেখা ব্যক্তিগত চিঠিও তুলে দিয়েছেন তারেকের হাতে। ইউনুস জমানার বিভীষিকার মধ্যেও, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের এই যে কূটনৈতিক কৌশল ভারত দেখাতে পারল তা একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। একইসঙ্গে পাকিস্তানের অতিতৎপরতা অতিসক্রিয়তার মাথায় এক কলস হিমশীতল জল ঢেলে দেওয়ারই শামিল। এই কূটনৈতিক যুদ্ধে ভারতের জয় হল বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে সাধু সাবধান! তারেক হলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র। তাঁর মা ক্ষমতা লাভ করেছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান পিতার আকস্মিক চিরশূন্যতার সুযোগে। কঠোর পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর মাঝে খালেদা টিকেও ছিলেন কৌশল করে। দেশি-বিদেশি মতলববাজদের হাতের পুতুল (এপার বাংলার মেয়ের ডাকনামও কাকতালীয়ভাবে এটাই) হিসেবে। অতিউগ্র ধর্মান্ধদের সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন তিনি। তারেকের আগমন ঘটেছে পরিস্থিতির কারণে। দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে কেটেছে তাঁর। রকমারি দুর্নীতি আর গ্রেনেড হামলার দায়ে দেশে তাঁর কারাদণ্ড হয়। বস্তুত ৮৪টি মামলা কাঁধে নিয়ে তিনি স্বেচ্ছানির্বাসন নেন লন্ডনে। ইউনুস সরকার অবশ্য ‘হাসিনার যাবতীয় ষড়যন্ত্র’ থেকে তাঁকে মুক্তি দেয়। ২০২৫-এর বড়দিনে তারেকের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে দেশের মাটিতে।   
ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি সবসময়ই কাম্য। কিন্তু তাতে তারেকের বিপুল ঘাটতি কারও নজর এড়ায়নি। রাজনীতি ও ক্ষমতাগ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক ধাপও তারেক পেরোননি ঠিক করে। এসব তাঁর রাজনৈতিক বীক্ষণকে প্রভাবিত করবে না কি? এই প্রসঙ্গও ফের সামনে এসেছে যে, স্বাধীনতার যোদ্ধা হয়েও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী এবং স্বাধীনতার শত্রুদের ‘পুরস্কৃত’ করতে জিয়াউর রহমানের হাত কাঁপেনি। সবাই জানে, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছিলেন এই আপসকামী মানসিকতাকে সঙ্গী করেই। তাঁর উত্তরসূরি খালেদাও তাঁকে অনুকরণ করে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন। স্বভাবতই এই দম্পত্তির শাসনকালে উন্মুক্ত হয়েছিল দুর্নীতির ফ্লাড গেট। আর তার চরম মূল্যই বারবার চোকাতে হয়েছে স্বাধীন সোনার বাংলাকে। ভোটব্যাংক রক্ষার সামনে বিপন্ন হয়েছে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র। 
গদিরক্ষার জন্য হুসেইন মহম্মদ এরশাদ ইসলামকে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ঘোষণা করেন। কিন্তু এই অবাঞ্ছিত সিদ্ধান্ত বদলের ‘দুঃসাহস’ আর কেউ দেখাননি। তার মধ্যে খালেদা জিয়ার নামও থাকবে। কারণ তিনি প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি দখল করেছিলেন তিনবার। মুজিব-পরবর্তী প্রতিটি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্মীয় আবেগ নিয়ে খেলেছিল। তার মাশুল আজও গুনছে হিন্দুসহ সমস্ত সংখ্যালঘু শ্রেণি। তবে সবকিছুকে পিছনে ফেলে শোক, আবেগে ভোটারদের ভাসাতে মরিয়া হবেন তারেক। কিন্তু তাতে রাষ্ট্র কতটা‌ গঠিত, উপকৃত ও উন্নত হবে? ইতিবাচক উত্তর মেলে না। কারণ যে-শক্তি তাঁকে গাছে তুলতে সক্রিয় তারাই যে মই কেড়ে নেওয়ার জন্য অতঃপর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? তারেকের পিছনে যারা ছুরি বসাবে, আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, তারা কখনওই ভারতবন্ধু শক্তি হবে না। বরং এই স্লোগানই নিখাদ সত্য যে, ‘রাজাকার পাকিস্তানি/ তুমিও জানো, আমিও জানি’। 
মায়ের মৃত্যুর পর তারেক দেশে ফিরতেই বিএনপি-জামায়াতের নতুন ঘনিষ্ঠতা লক্ষণীয়। গতবছর ‘জুলাই বিপ্লবের’ (সন্ত্রাস নয় কি?) পরই অবশ্য ইউনুসকে শিখণ্ডী রেখে ক্ষমতার বাটোয়ারা করে অন্তর্বর্তী সরকার চলছিল। কিন্তু দুই অসতের দোস্তির হাল যা হয়, দ্রুত সেটাই দেখল সবাই। ‘স্বাধীনতার শত্রু’ আর ‘দুর্নীতির গুরুঠাকুর’ তরজায় ভেঙে গিয়েছিল সেই মহব্বত। কিন্তু ‘যমজ ভাইয়ের সেই ভাঙা সংসার’ ফের জোড়া লাগাবার মরশুম এনে দিয়েছে ভোট। দিনের শেষে একটা ‘নির্বাচিত’ সরকার না-হলে দেশ-দুনিয়ার কাছে মান থাকে কী করে? অতএব চিরশত্রু আওয়ামি লিগকে গ্রহের বাইরে নিক্ষেপ করেই সেনাবাহিনীর কুণ্ঠাহীন সহযোগিতায় সেই ‘প্রহসন’ অনুষ্ঠানে ব্যস্ত তাঁরা। অনুমান করা হচ্ছে, ‘যুদ্ধাপরাধের’ প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতকে প্রকাশ্যে অস্বস্তিতে ফেলবে না বিএনপি। অন্যদিকে, দুর্নীতির প্রসঙ্গে ‘বোবার শত্রু নেই’ নীতি নিয়ে ব্যালান্সের খেলা চালাবে জামায়াত। সন্ধির এই শর্তই আপাতত শিরোধার্য জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এবং বিএনপি শীর্ষকর্তা তারেক রহমানের। পার্লামেন্টে আসন ভাগাভাগির এই গোপন চুক্তিতে জনগণ বসে থাকবে দর্শকের আসনে। অথচ, হাসিনাকে দেশছাড়া করতে সোনার বাংলাকে জাহান্নামে পাঠানো হয়েছে নির্বাচনে কারচুপি, দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্রের দোহাই পেড়ে।  
তাই কূটনীতির তাৎক্ষণিক খেলায় আসিম মুনির হেরে গিয়েছেন ভেবে চাপা উল্লাসেরও কোনও যুক্তি নেই। এত বিশৃঙ্খলার মধ্যেও কেন যেন মনে হয়, আগামী দিনে বাংলাদেশে যেকোনও সরকার একবগ্গা পাকিস্তানপন্থী হওয়ার আগে ভাববে। তাদের সঙ্গে ইউনুসের তফাতটাও প্রকট হতে পারে দ্রুত। এখনও বিশ্বাস হয়, যারা এতটা ভারত-বিরোধী এবং উগ্র ইসলামের প্রচারক, তারা অবশ্যই ‘সংখ্যালঘু’। সংখ্যগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছা বাসনা দেরিতে হলেও পূরণ হবে। দেশবাসী নিশ্চয় সেইদিনের প্রতীক্ষায় হবে অচঞ্চল। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এক নেত্রীর প্রয়াণে শোকবার্তা নিয়ে মোদির দূত ঢাকায় গিয়েছেন। এটাই ভারতীয় সংস্কৃতির শিষ্টাচার। তবে কৌশলের এই খেলায় বিশেষ সতর্ক পদক্ষেপও করতে হবে ভারতকে। এটাই কৌটিল্যের শিক্ষা। ভোটের রাজনীতিতে তড়িঘড়ি দু’কদম এগিয়ে থাকার বাসনায় চালের ভুল করলেই বিরাট মাশুল গুনতে হতে পারে। যে-দেশ বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার পরিবর্তে পড়শির সঙ্গে হাজার বছরের যুদ্ধের মতো ঘৃণার রাষ্ট্রনীতি আঁকড়ে থাকে, তার ছায়াটাকেও ছাড় দেওয়া চলে না।  
***
এপারে, বঙ্গ বিজেপি সংগঠনের হাল দেখে মোদির ডানহাত শাহ রীতিমতো হতাশ, স্বভাবতই ক্ষুব্ধও। সংগঠন চাঙ্গা করার প্ল্যান নিয়ে নাকি এগচ্ছেন তিনি। দাবি, টু থার্ড মেজরিটির পদ্মশোভিত সরকার বসবে নবান্নে। আহা, মোদির রাজনৈতিক জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণ আর তিন-চার মাস দূরে মাত্র! কিন্তু এসআইআর’ই যে মোদিবাবুর পার্টির জন্য ‘মরিব মরিব কৌশল করি মরিব’ হয়ে বসে আছে—এই চরম সত্যটা এখনও নজরে না-পড়লে মোদি-শাহের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। 
সোজা কথায়, ছাব্বিশে জোড়া-বঙ্গ-বিজয়-অভিযানের ইতিবৃত্ত দিল্লীশ্বরের জন্য শুধুই মনখারাপ লিখবে না তো?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ