মৃণালকান্তি দাস: মোথাবাড়ির দুই বন্ধুর গল্প বিজেপি নেতারা শুনেছেন কি না জানি না। তবে গত বছর তাদের ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ার পর এ রাজ্যের মানুষ আরও একবার গর্ব করে বলেছিলেন, এটাই বাংলা। এটাই বাঙালির পরিচয়...
মৃণালকান্তি দাস: মোথাবাড়ির দুই বন্ধুর গল্প বিজেপি নেতারা শুনেছেন কি না জানি না। তবে গত বছর তাদের ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ার পর এ রাজ্যের মানুষ আরও একবার গর্ব করে বলেছিলেন, এটাই বাংলা। এটাই বাঙালির পরিচয়...
ঘটনাটি মালদহের মোথাবাড়ি বিধানসভার বাঙিটোলা চক্রে অলিটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। সেই স্কুলেরই ছাত্র, বাঙিটোলা ফিল্ডপাড়ার বাসিন্দা সন্দীপ এবং সোলেমান। স্কুলের ডাইনিং রুমে সন্দীপ আর সোলেমানকে এক থালায় মিড-ডে মিল খেতে দেখে মোবাইলে ভিডিয়ো-বন্দি করেছিলেন স্কুলেরই শিক্ষক রবিউল ইসলাম। সন্দীপ এবং সোলেমান তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। সেই ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমেও দিয়েছিলেন রবিউল। স্টিলের থালায় ভাতের উপরে ছড়ানো সয়াবিন-আলুর ঝোল, আর সেই একই
থালা থেকে ভাত মেখে খাওয়ার দৃশ্য দেখে আশা জাগে মনে— ধর্মের নামে বিষ ওদের জীবনে এখনও আঁচড় কাটতে পারেনি। বারবার মনে হয়, বাংলার বহুত্ববাদের রক্তক্ষরণ ঠেকাতে সন্দীপ-সোলেমানদের আজ খুব প্রয়োজন।
সন্দীপের বাবা শম্ভু ভ্যান চালান। সোলেমানের বাবা রসুল শেখ দিনমজুর। মুখে হাসি নিয়ে সন্দীপ এবং সোলেমান বলেছিল, ‘আমরা রোজ একসঙ্গে স্কুলে যাই। মিড-ডে মিল একসঙ্গে খাই। আমাদের দু’জনের নামের প্রথম অক্ষরও এক। আমরা কী করে তবে আলাদা?’ এই অতি সরল কথাগুলি ভাবতেই পারেন না অ-বাঙালি, হিন্দিভাষী বিজেপি নেতারা। তাই সন্দীপ-সোলেমানদের বিচ্ছিন্ন করার খেলায় মেতে থাকে গেরুয়া শিবির। অনুপ্রবেশের তকমা লাগিয়ে কিংবা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে। জানি না, সন্দীপ-সোলেমানদের পরিবারের এখন কী অবস্থা?
বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ তো পুরানো কাসুন্দি, হাজার হাজার রোহিঙ্গা যোগে তার ঝাঁঝ আরও বাড়িয়েছে গেরুয়া শিবির। গত স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর লালকেল্লার ভাষণেও শোনা গিয়েছে সেই ঝাঁঝ— ঘুসপেটিয়া! বিধানসভা ভোটের প্রচারে এসেও একই সুর তুলেছেন নরেন্দ্র মোদি। যার ফলে ধর্মীয় পরিচয়ই ক্রমশ ভোটের প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে। অথচ, এসআইআরের ভয়ঙ্কর ঝাঁকুনিতে এখনও খোঁজ মিলল না কোনো রোহিঙ্গার। বোঝাই যায়, রোহিঙ্গা কিংবা অনুপ্রবেশতত্ত্ব আজ ভোটের সহজলব্ধ হাতিয়ার। ঘুসপেটিয়ার জুজু খাড়া করে রাজ্যজুড়ে এক বিধ্বংসী বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, যার মাদকতায় রাজনৈতিক সুবিধা লোটা যায়। এই রসায়নে এসআইআর-র ভূমিকা অনুঘটকের! যার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি সামলাতে হচ্ছে এ রাজ্যের বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের। এবং মহিলাদের।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা প্রশ্ন তুলেছেন, অন্য রাজ্যেও তো সম্প্রতি এসআইআর হয়ে গিয়েছে। কই, সেখানে তো এত গোলমাল হয়নি? পশ্চিমবঙ্গে হচ্ছে কেন? এর উত্তর অতি সহজ। পশ্চিমবঙ্গে এ বারের এসআইআর কেবল ভোটার তালিকা সংশোধনে সীমিত থাকেনি। প্রথম দিন থেকেই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তারা, সকলে বলে এসেছেন পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর একটি প্রধান উদ্দেশ্য এই রাজ্যের লক্ষ লক্ষ তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ভোটারকে শনাক্ত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। অর্থাৎ, এসআইআর পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। অন্য কোনো রাজ্যে তা হয়নি। এটাই চেয়েছে গেরুয়া শিবির। উদ্দেশ্য— বাংলাকে লন্ডভন্ড করে দাও। বেছে বেছে বাদ দাও সংখ্যালঘুদের নাম। প্রতি বুথের জনবিন্যাস পালটে দাও।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই বিভাজনের রাজনীতি থামাতে চান না, বরং উসকে দিয়ে দেশকেই দুটো ভাগ করে দিয়েছেন! এখন তাঁর নজর বাংলা। অথচ, মুসলিম রাষ্ট্রে গিয়ে সেই মোদিজিই আবার গলায় গলায় জড়িয়ে ধরেছেন শেখদের। মোদি এ দেশের মাটিতে হিন্দুত্ব-হিন্দুত্ব করেন, তারপরই সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরিন, ইরান, জর্ডন, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় গিয়ে গলাগলি করেন। মুসলিম দেশগুলির স্ট্যাম্প উপচে পড়েছে মোদির পাসপোর্টে। তাহলে, দেশের ভিতরে এই হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখার দরকার কী? কেন সন্দীপ-সোলেমানদের মনে বিদ্বেষের বীজ বপন করা হবে?
এ রাজ্যের ‘ভক্তকুল’ ক্রমাগত মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েছে। ঘৃণার দুর্গ তৈরি করছে মোদি মন্ত্র জপে! আর ওদিকে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিম এশিয়ার যে দেশেই গিয়েছেন, জড়িয়ে ধরেছেন শেখদের। আরব থেকে সেখানকার সর্বোচ্চ অসামরিক সোনার পদক জিতে এনেছেন। সৌদি থেকে কিং আবদুল আজিজ স্যাশ, আমিরশাহি থেকে অর্ডার অব জায়েদ, প্যালেস্তাইন থেকে গ্র্যান্ড কলার অব দ্য স্টেট অব প্যালেস্তাইন, মিশর থেকে অর্ডার অব দ্য নাইল। তাঁর দলের নেতা, কর্মীরা মুসলিমদের নিয়ে কথা বলতে গেলেই বলেন, না পোষালে পাকিস্তানে চলে যাও। বাংলাদেশে চলে যাও। আর ওদিকে, মোদি ঘনঘন ঘুরে বেড়াবেন মুসলিম দেশে। একে দ্বিচারিতা ছাড়া আর কী বলা যায়! বাংলার সেই সব কপালে লাল টিপ দেওয়া মোদি ভক্তদের মুখ মনে পড়ে, যাঁরা সংখ্যালঘু বয়কটের হুমকি দেন আর কিছুক্ষণ পরে টিভিতে দেখেন তাঁদের ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’ আবু ধাবিতে ‘আহলান মোদি’ ইভেন্টে শেখদের সঙ্গে উচ্ছ্বাসে ভাসছেন। মোদি ভক্তরা মসজিদে মসজিদে মন্দির খুঁজে বেড়ান আর তাঁদের ‘হৃদয় সম্রাট’ মসজিদের রেপ্লিকা নিয়ে যান বিদেশে। সৌদি আরবে গিয়ে যুবরাজ সলমনের হাতে তুলে দেন ভারতের প্রাচীনতম মসজিদ কেরলের শিরামন জুমা মসজিদের সোনার জল করা রেপ্লিকা! কারণ একটাই— বাণিজ্য। গেরুয়া শিবিরের মতে, দেশে যার নাম মেরুকরণ, বিদেশে সেটাই বিশ্বায়ন। এরপর বুঝতে অসুবিধে হয় না, আমাদের দেশে বুলডোজার, এনআরসি, হিজাব, হালাল বিতর্ক, অনুপ্রবেশ থেকে এসআইআর— সব চলে শুধু ভোটের অঙ্কে? এই দ্বিচারিতা করে বাংলায় কি ভোটে জেতা যায়?
গেরুয়া শিবির বুঝে গিয়েছে, মৌলবাদ দ্রুত ফল দেয়। উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এসব দীর্ঘমেয়াদি কাজ। কিন্তু ধর্মীয় উসকানি মুহূর্তে জনতাকে জড়ো করে। ভোটের লড়াইয়ে এই তাৎক্ষণিক সমর্থনই অনেক রাজনীতিকের কাছে অমূল্য। তাই মৌলবাদকে কখনো নীরব প্রশ্রয়, কখনো প্রকাশ্য সমর্থন—দুটোই দেখা যায়। যার প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি পড়ছে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, দুই ২৪ পরগনা জেলাগুলিতে। লক্ষ্য করে দেখুন, এসআইআরে এই জেলাগুলিতেই সবচেয়ে বেশি বাতিল হয়েছে সংখ্যালঘুদের নাম। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তাদের ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ স্লোগান নিয়ে তৃণমূলের দুর্নীতি-অপশাসন হটিয়ে শিল্পোন্নয়ন, চাকরি আর জনকল্যাণের জোয়ার বইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। লাভ হয়নি। মোদিজি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো দাড়ি রেখে বাঙালির মন জয়ের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাতে সফল হননি। তাদের আসন সংখ্যা কমে গিয়েছিল। তাই এ বার বিজেপির প্রচারের প্রধান বিষয় অনুপ্রবেশ। আরও সহজ করে বললে, সংখ্যালঘুদের এই রাজ্য থেকে তাড়াও! ভোট থেকে বঞ্চিত কর! যে সরকার বাংলার মন বুঝতে ব্যর্থ, ভোটতালিকা তৈরির সূত্রে এখন সে বাঙালিদের নাগরিকত্ব হরণের চেষ্টায় ব্যস্ত। এর থেকে বিপজ্জনক সময় বাংলার গণতন্ত্র আগে কখনো দেখেনি!
মূল সমস্যাগুলি থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার এও এক কৌশল। সাম্প্রদায়িকতার এই বিভাজনে কণ্ঠরোধ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার ধারণার, প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে কাজী নজরুলের ধর্মীয় মিলনের আহ্বান। ধর্মের বিভাজন ছড়ানোর কারবারিরা জানেন, ধর্মের ভেদাভেদের পরেও পড়ে থাকবে আরও অসংখ্য ভেদাভেদ: জাতপাতের ভেদাভেদ, প্রাদেশিকতার ভেদাভেদ, ভাষার ভেদাভেদ, গ্রাম-শহরের ভেদাভেদ। এর শেষ কোথায়?
অনেকের ধারণা, মুসলিমরা অধিক অনুপাতে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকার কারণ পদ্ধতির সমস্যা নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন যতটা পারা যায় মুসলিম ভোটারের সংখ্যা কমাতে চাইছে। বিধানসভার জনবিন্যাস বদলে দিতে চাইছে। গেরুয়া শিবিরের এক শীর্ষনেতা বলেছিলেন ‘ব্রেকফাস্টে এত লক্ষ, লাঞ্চে এত লক্ষ, ডিনারে এত লক্ষ ভোটার খাব।’ প্রভু-ভৃত্য নির্বাচন কমিশন অবিকল তাই করেছে। তাঁরা যেন ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’। কর্তার আজ্ঞায় কর্ম! এরপরও সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, এবার ভোট দিতে না পারার অর্থ এমন নয় যে ভোটাধিকার চলে গেল। মহামান্য আদালত একবারও ভাবল না, এতে ২০২৬-এর ভোটে কার সুবিধে হবে! মোদি সরকার যদি এরপর কোনো ইস্যুতে বলে, যারা ভোট দিতে পেরেছেন তারাই এ দেশের নাগরিক— তখন কী হবে? বিজেপি সরকার যে এটা বলবে না, তার নিশ্চয়তা কী? আমরা তো বছরের পর বছর ধরে দেখছি, কেন্দ্রের সরকার দেশের নাগরিকদের নানা ইস্যুতে শুধুই ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। সেই নোটবন্দি থেকে শুরু হয়ে আজ এসআইআর...
আজকে মোদির ভারতের প্রতিটি সকাল শুরু হয় দু’টি সমান্তরাল সংবাদচক্র দিয়ে। একটি টেলিভিশনের পর্দায় প্রচারিত এবং সযত্নে সাজানো বিতর্কসভা, যেখানে ‘হিন্দু গৌরব’ ও ‘নতুন ভারত’-এর নাট্যশৈলী নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যটি প্রচারিত হয় না, কিন্তু বাস্তব— প্রতিদিনের মুসলিম নিপীড়ন, পিটিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তার, অপমান ও অমানবিকীকরণ। এই দুইয়ের মাঝখানে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বার্তা: মুসলিমদের কষ্ট, হয় মুছে ফেলা, নয়তো তা রূপ নেয় এক প্রদর্শনীতে। যা সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য হয়ে ওঠে সন্ধ্যার বিনোদন। মুসলিমরা বাধ্য হয় এমন এক গণ্ডিতে আটকে পড়তে, যেখানে তারা যেন চিরকালীন অপরাধী, সব সময় অভিযুক্ত। কখনো শোনা যায় না তাদের কথা। একেই বলে বিভাজনের নীলনকশা!
মার্কিন চিন্তাবিদ মাহমুদ মামদানি তাঁর বিখ্যাত বই ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম”-এ তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, রাষ্ট্র ও সমাজ কীভাবে মুসলিমদের দুই ভাগে ভাগ করে। ‘গ্রহণযোগ্য’ মুসলিম, যে চুপচাপ মানিয়ে নেয় আর ‘বিপজ্জনক’ মুসলিম, যে প্রতিবাদ করে বা মর্যাদা দাবি করে। ভারতে এই বিভাজন প্রতিদিন অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। যে মুসলিম তার ধর্ম গোপন রাখে, অদৃশ্য হয়ে থাকে— সে সহনীয়। কিন্তু যে প্রকাশ্যে সমান অধিকারের দাবি তোলে, যে মুছে ফেলা মানে না— সে মুহূর্তেই হয়ে যায় অপরাধী। মামদানি মনে করিয়ে দেন, বিষয়টি ধর্মতত্ত্ব নয়— এটি ক্ষমতার প্রশ্ন: কে বৈধতা নির্ধারণ করবে আর কে বাঁচবে সন্দেহের ছায়ায়!
ইতিহাস শিখিয়েছে, বিভাজনের রাজনীতি, ঘৃণার বিনোদন একদিন গোটা সমাজকেই গ্রাস করে। নরকের অতল গর্ভে তলিয়ে যায় সেই সমাজ!