তন্ময় মল্লিক: দু’পক্ষের ঝামেলার মাঝে কেউ বাবা-মা তুলে গালি দিলে ঘটে যায় রক্তারক্তি কাণ্ড। প্রতিটি সন্তানের কাছেই তার বাবা, মায়ের একটা বিশেষ জায়গা থাকে। তাই বাবা-মাকে টেনে কেউ খারাপ কথা বললে গায়ে লাগাটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও লেগেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াত মায়ের প্রতি কুরুচিকর মন্তব্য করে বিহারের ওই যুবক চরম অন্যায় করেছে। সমস্ত রাজনৈতিক দল একযোগে নিন্দা করেছে। অভিযুক্ত গ্রেপ্তারও হয়েছে। বিষয়টি এখানেই মিটে যাওয়ার কথা। কিন্তু
মেটেনি। উল্টে এটাই এখন ইস্যু। কারণ মোদিজি খুব ভালো করেই জানেন, বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর নাম নীতীশ কুমার হলেও জোট সরকারের মুখ তিনিই। তাঁকে দেখেই মানুষ বিজেপিকে ভোট দেয়। তাই এসআইআর-এর ধাক্কায় টলমল জোট সরকারকে বাঁচাতে জড়ালেন নিজেকে। আর টেনে আনলেন প্রয়াত মাকে। এর নাম রাজনীতি!
সাধারণ মানুষ কোনও দিনই রাজনীতিতে
কুকথা পছন্দ করে না। কিন্তু রাজনীতির কারবারিরা কুকথা বলেন। উদ্দেশ্য প্রচারে ভেসে থাকা।
নিজেকে জাহির করা। তবে, মানুষ তাঁদের মোটেই ভালো চোখে দেখে না। তবুও রাজনীতিতে কুকথা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো থাকবে। কিন্তু বিহার ইস্যুতে বিজেপি এমন ভাব করছে যেন তাদের দলের নেতারা কোনও দিন কটু কথা বলেননি। বাস্তবটা ঠিক তার উল্টো। বাংলায় একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে বিজেপি নেতারা অহরহ কদর্য ভাষায় আক্রমণ করে যাচ্ছেন।
একুশের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে পায়ে চোট পেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে গোটা রাজ্যে প্রচার করায় বিজেপির দিলীপ ঘোষ তাঁকে বারমুডা পরার পরামর্শ দিয়েছিলেন। একজন মহিলার প্রতি এহেন মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্ব
তার কোনও প্রতিবাদ করেনি। দিলীপবাবুর মধ্যে কোনও অনুতাপ হয়নি, উল্টে দাবি করেছিলেন,
তিনি ঠিকই বলেছেন।
বিজেপির কর্মীদের মধ্যে দিলীপবাবু অবশ্যই জনপ্রিয়। তবে, বাংলার শিক্ষিত সমাজ তাঁকে পছন্দ করে, এমন দাবি তাঁর অন্ধভক্তও করতে পারবেন না। কিন্তু অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়? তিনি শিক্ষিত এবং পণ্ডিত। হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। সেই অভিজিৎবাবু কী বলেছিলেন? ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তোমার দাম কত?’ অভিজিৎবাবুর মন্তব্য শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করায় নির্বাচন কমিশন তাঁকে ‘সেন্সর’ করেছিল। কিন্তু বিজেপি তারজন্য ক্ষমা চায়নি। উল্টে বিষয়টি ‘ব্যক্তিগত’ বলে এড়িয়ে গিয়েছিল।
কুকথা বলার ব্যাপারে সংস্কৃতির বুলি কপচানো সিপিএমের রেকর্ডও যথেষ্ট উজ্জ্বল। সেই তালিকায় সুশান্ত ঘোষ, বিনয় কোঙার তো আছেনই। তবে, সবাইকে টেক্কা দিয়েছিলেন আরামবাগের প্রয়াত সাংসদ অনিল বসু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি এবং নিষিদ্ধপল্লির প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি ইতিহাসের কালো পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন। যোগ্য উত্তরসূরি হতে চলেছেন সিপিএমের উদীয়মান যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। প্রকাশ্যে তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষকে এমন ভাষায় আক্রমণ করেছেন যা সংবাদপত্র ছাপতে পারেনি। আর টিভি চ্যালেনগুলি সেই জায়গাটায় ‘বিপ’ দিতে বাধ্য হয়েছে।
রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও পিছিয়ে নেই। বিরোধীদের হুমকি দিতে গিয়ে লাগামছাড়া হয়েছিলেন প্রয়াত সাংসদ তাপস পাল। ক্ষমতার দম্ভে ভুলে গিয়েছিলেন, সিনেমায় যে সংলাপ বলে দর্শকের হাততালি পাওয়া যায় জনসভায় সেকথা বললে মানুষ ঘৃণা করে। দেশের মহিলা রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে অখিল গিরির কদর্য মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর অখিলবাবুকে খোয়াতে হয়েছে মন্ত্রিত্ব। তবে, এব্যাপারে অনিল বসুর সঙ্গে সমানে টক্কর নিয়েছেন অনুব্রত মণ্ডল। একটি অডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে কেস হয়েছে। অনুব্রত জামিনও নিয়েছেন। কিন্তু, পুলিস অফিসারের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলেছেন, তাতে তিনি মানসিক বিকারগ্রস্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে অন্যায় হবে না।
বিরোধী শিবিরকে আক্রমণ করতে গিয়ে শালীনতার মাত্রা অতিক্রমের ঘটনা ঘটেছে বারে বারে। সেই দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে গেলে একটা মহাভারত হয়ে যাবে। দলীয় নেতাদের কটু কথায় কর্মীরা উল্লসিত হলেও সাধারণ মানুষ বিরক্ত হয়। কিন্তু, রাজনীতির কারবারিদের তাতে কিছু যায় আসে না। শোধরানোর কোনও লক্ষণ নেই। এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই যাঁরা এসব কথা বলেন জন্মের পর তাঁদের মুখে মায়েরা মধু দেননি। সন্তান মিষ্টভাষী হবে, সকলের প্রিয় হবে, এই আশায় তাঁদের মায়েরাও সন্তানের মুখে মধু দিয়েছিলেন। কিন্তু, লোভ আর প্রতিহিংসার আগুনে সেসব শিকেয় তুলে দিয়েছেন। ণত্ব-ষত্ব জ্ঞান বিলোপ পেয়েছে। তাঁরা কেন বুঝতে পারেন না, অন্যের গায়ে কালি মাখানোর জন্য কুৎসিত ভাষা প্রয়োগ করলে নিজের পারিবারিক শিক্ষাকেই কালিমালিপ্ত করা হয়।
রাজনীতিতে কুকথার ফুলঝুরি ছোটে। অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা তা গায়ে মাখেন না। বিবেচকরা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয় মনে করেন। প্রতিবাদ পর্যন্ত করেন না। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু প্রসঙ্গটা তুললেন এবং প্রতিবাদও করলেন। যদিও তাঁর মা-কে অপমানের জবাব দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন
বিহারের মা-বোনেদের। তিনি বলেছেন, ওই কুকথা বলে শুধু নরেন্দ্র মোদির মাকেই নয়, বিহার তথা দেশের সব মহিলাকেই অপমান করা হয়েছে। বিহারের অর্ধেক আকাশ নারী শক্তির এই অপমান কোনওভাবেই সহ্য করবে না।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে তাঁর মাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন এবং শ্রদ্ধা করেন, তা গোটা দেশের মানুষ জানে। প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেও তিনি বারেবারে ছুটে গিয়েছেন মায়ের কাছে। মাকে প্রণাম করা, মাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া, মায়ের গলায় মালা পরিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর অজস্র ছবি আমাদের চোখের সামনে ভাসে। ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি তিনি ১৪০কোটি দেশবাসীর সঙ্গে ভাগ করে নেন। তাই কেউ তাঁর প্রয়াত মাকে নিয়ে কুকথা বললে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটাই স্বাভাবিক। তবে, তিনি কোনও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেননি। ব্যক্তিগত কষ্ট ভাগ করে নিয়েছেন লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সঙ্গে। সেটাই স্বাভাবিক। মায়ের অপমান মা-বোনেরাই বুঝবেন। কিন্তু তিনি সেটা নিজের রাজ্য গুজরাতের নারীশক্তির সঙ্গে ভাগ না করে, করলেন বিহারের মা-বোনেদের সঙ্গে। তাঁর দাবি, কংগ্রেস ও আরজেডি ‘নারী বিদ্বেষী’। আর তারজন্যই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তাঁর মা-কে সামনে রেখে রাজনীতি করার অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা।
প্রশ্ন উঠছে, একজন অজানা, অচেনা যুবকের মন্তব্যকে দেশের প্রধানমন্ত্রী এত গুরুত্ব দিতে গেলেন কেন? কংগ্রেসের দাবি, ‘গোটাটাই পূর্ব পরিকল্পিত। মোদিজি চোখের জল ফেলে মা-বোনেদের মন গলাতে চাইছেন। এসআইআর থেকে নজর ঘোরানোই তাঁর উদ্দেশ্য।’
গোটা ঘটনাটা পূর্ব পরিকল্পিত কি না, সেটা বলা কঠিন। কিন্তু একজন অখ্যাত যুবকের মন্তব্যকে সামনে রেখে পাঁচ ঘণ্টার বিহার বন্ধ ডাকার পিছনে উদ্দেশ্য একটাই। রাজনীতি। রাহুল গান্ধীর ‘ভোটার অধিকার যাত্রা’ ঘিরে বিহারে যে উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে তাকে প্রতিহত করতেই কি অখ্যাত যুবকের মন্তব্যকে এত গুরুত্ব? এর আগে গোটা দেশে মণিপুর, হাতরাস, পহেলগাঁওয়ের মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী তো এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেননি!
অনেকে বলছেন, মোদিজি কেঁচোর সন্ধান
করতে মাটি খুঁড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেরিয়ে পড়ছে একের পর এক কেউটে। নরেন্দ্র মোদির মুখ দিয়ে
বের হওয়া ‘জার্সি গাই’, ‘হাইব্রিড বাছুর’ জাতীয় মন্তব্যগুলি নতুন করে জনসমক্ষে আনার সুযোগ পেয়ে গেল বিরোধীরা। এসব কথা যখন বলেছিলেন, তখন তিনি কোনও অখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন না,
ছিলেন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। সেই সময় সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী সম্পর্কে করা তাঁর এইসব মন্তব্য কি শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করেনি? আর একুশের নির্বাচনী প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে তাঁর ‘দিদি অ দিদি’ ডাক কি মহিলাদের খুব সম্মানিত করেছিল?
মোদিজি, বিহারের সমবায় সমিতির ভার্চুয়াল সভায় উপস্থিত মা-বোনেরা আপনার চোখে জল দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা আপনার সমব্যথী হয়েছেন। তাঁরা কেঁদেছেনও। কিন্তু সেই জল জার্সি গাই, হাইব্রিড বাছুর, দিদি অ দিদি কটাক্ষগুলিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারবে? উত্তরটা হল, না।
কারণ যে মারে সে ভুলে যায়, কিন্তু যে মার খায় সে আমৃত্যু মনে রাখে।