৪ মে দুপুর বারোটার পর মনে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে মমতা শাসনের অবসানের সঙ্গেই দেশে বিরোধী রাজনীতিরও অন্তিম ক্ষণও বুঝি সমাগত। এক দেশ এক নির্বাচনই নয়, এক দল এক চিন্তা ও এক দর্শনই আমাদের ভবিতব্য! তারপর তিন মাসও যায়নি। বারবার প্রমাণ হচ্ছে দেশটা ভারতবর্ষ। বহুত্ববাদের মধ্যেই তার অন্তরাত্মার অনাবিল বিচরণ। কেউ তাকে সহজে বদলাতে পারবে না, খাঁচায় পুরতেও সফল হবে না। বহু চেষ্টা করেও ইন্দিরা পারেননি, মোদিজিও পারবেন না। শেষ কথা বলবে সংবিধানই। শাসকের চিৎকার ঢেকে শেষ কথা বলবে সাধারণ মানুষই। প্রমাণ হল, গণতন্ত্রে শূন্যস্থান কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিরোধীরা বিক্রি হলেও সাধারণ মানুষের ক্ষমতার সামনে মাথা নীচু করতে হয় ধুরন্ধর শাসককেও। এটাই বারে বারে শিক্ষা দিয়েছে আমাদের গণতন্ত্র!
তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হলে আরশোলারা এগিয়ে আসে। বিহারের বাইরে তেমন পরিচিতি না থাকলেও মাত্র আট মাস আগে জন্ম নেওয়া প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টিই মোক্ষম শিক্ষা দিয়ে যায় পরাক্রান্ত শাসককে। জেন জি নামক খোলা হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যায় থমকে থাকা চিন্তাধারাকে। এই দুই নবাগত শক্তিই প্রমাণ করল বিরোধীদের ঝাড়ে-বংশে ম্যানেজ করে কেউ নিজেকে অধীশ্বর ভাবতেই পারেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ কেউ নেই ভাবাটা ডাহা বোকামি। কারণ, ইতিহাসে শাসক এ ভুল বারবার করেছে, শেষে চড়া মাশুলও দিয়েছে। পাঁচ দশ পনেরো...৩৪ বছর টানা ক্ষমতার শীর্ষে থেকে কর্তৃত্বের অপার দম্ভ ভোগ করার পর কখন অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছেন, কেউ বিশেষ আর মনে রাখেনি। বিগত পনেরো দিন বিজেপির দর্পচূর্ণেরই উদযাপন হচ্ছে যেন। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে মোদি মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা দিয়ে শুরু। অশান্ত যন্তরমন্তর। বাধ্য হয়েই ছাত্রযুবদের দাবি মানতে বাধ্য হয়েছে সরকার। তার পরপরই দুই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যের উপনির্বাচনে বিরাট পরাজয়। বিহার ও মধ্যপ্রদেশ। সর্বভারতীয় বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীনের গড় বাঁকিপুরে গেরুয়া পতন তিন দশক পর। হিসাব কিন্তু মিলছে না। এর থেকে বিজেপির প্রথম শিক্ষা হল, কোনো ভোট, কোনো নির্বাচনি পরিণামই চিরস্থায়ী নয়। জানাদেশ বদলে বদলে যায়। এটাই ভারতের গণতন্ত্রের মাহাত্ম্য! জনমতের শক্তি! বাঁকিপুর পাটনা শহরের একটি বড়ো অংশ নিয়ে গঠিত। উচ্চবর্ণ, শহুরে মধ্যবিত্ত এবং ব্যবসায়ী ভোটারদের সমর্থন দীর্ঘদিন ধরেই এখানে বিজেপির জনসমর্থনের প্রধান ভিত্তি। আত্মসন্তুষ্টি থেকে দল ধরে নিয়েছিল, প্রার্থী বা স্থানীয় পরিস্থিতি যা-ই হোক, এই ভোটব্যাংক পাশেই থাকবে। যাকে খুশি দাঁড় করালেই গড় অটুট থাকবে। সেই আত্মবিশ্বাসকে চুরমার করে দিয়েছে বাঁকিপুরের ভোটাররা। স্বয়ং জাতীয় সভাপতির গড়ে বিপর্যয় তাই ঘুরিয়ে মোদিজিকেই চ্যালেঞ্জ! প্রশান্ত কিশোরের জয় বিজেপির সেই আত্মবিশ্বাসে বড়ো ধাক্কা দিল। বাঁকিপুর দেখাল, উচ্চবর্ণের সমর্থন কারও স্থায়ী সম্পত্তি নয়। বিকল্প পাওয়া গেলে পুরানো সমর্থকের একাংশও অন্য দিকে যেতে পারেন অথবা ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। মাত্র ৩৪.৩০ শতাংশ ভোট পড়েছে। ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল ৪১.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ সাত শতাংশেরও বেশি ভোটার এবার বুথে যাননি। কেন বাকিরা ভোট দিতে গেলেন না, কেন শহুরে ভোটাররা মুখ ফেরাল? একটি সামান্য উপনির্বাচনের ফলাফল কীভাবে দৃষ্টান্ত তৈরি করে তারও অজস্র উদাহরণ আছে।
বাঁকিপুরে প্রশান্ত কিশোরের জয়ও তিনটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে গেল। প্রথমটি বিজেপির জন্য, দ্বিতীয়টি তেজস্বী যাদবদের জন্য, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি রইল বিহারের জন্য। বাঁকিপুরে নবজাতক জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর পেয়েছেন ৬৪,১৫১ ভোট। নির্বাচনি কৌশল তৈরি করে অন্য দলকে জেতানোই যাঁর পরিচয় ও পেশা, নিজের প্রথম নির্বাচনি লড়াইয়ে দীর্ঘদিনের গেরুয়া দুর্গ দখল করে তিনি প্রমাণ করলেন, জেতার ক্ষমতা তাঁর ষোলোআনা রয়েছে। এই জয় বুঝিয়ে দিল এই ক’মাসেই পাটনার চারপাশে নতুন হওয়া বইতে শুরু করেছে। বাঁকিপুর আসনটি তৈরি হওয়ার পর প্রতিটি নির্বাচনেই বিজেপি জয়ী হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রায় তিন দশক এই এলাকা গেরুয়া শিবিরের নিরাপদ ঘাঁটি। গত চারটি বিধানসভা নির্বাচনে নীতিন নবীনই এই কেন্দ্র থেকে টানা জয়ী। ২০২৫ সালের নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ৯৮,২৯৯ ভোট। নিকটতম আরজেডি প্রার্থী রেখা কুমারীকে হারিয়েছিলেন ৫১,৯৩৬ ভোটে। জন সুরাজের প্রার্থী বন্দনা কুমারী পেয়েছিলেন মাত্র ৭,৭১৭ ভোট। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সেই কেন্দ্রেই প্রশান্ত কিশোরের দলের ভোট ৭,৭১৭ থেকে বেড়ে ৬৪ হাজারের বেশি হয়ে গেল। আর বিজেপির ভোট ৯৮ হাজার থেকে নেমে এল ৪৪ হাজারে। জনসমর্থনের এই বিপুল হাতবদল রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ গুজরাতে বিজেপির জয়ের ব্যবধানও এক ধাক্কায় কমে যাওয়া। মানুষের এই রায় বলছে, শাসক বিজেপি তুমি হুঁশিয়ার। মানুষ কিন্তু সজাগ দৃষ্টিতে সব দেখছে। নেতা কেনা যায়, কিন্তু মানুষের উপর অপারেশন লোটাস কাজ করে না। শাসকের যাবতীয় নষ্টামি-ভণ্ডামি মানুষ কিন্তু সজাগ দৃষ্টিতেই দেখতে থাকে। তারপর সময়মতো শিক্ষা দিয়ে যায়। সর্বনাশ নেমে আসার আগেই সতর্ক হোন!