সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: আয়ের সংস্থানে বিশেষ বিকল্প ১২ বছরেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অতএব এবার আর দ্বিধা নয়। ‘আর্থিক সংস্কার’ নাম দিয়ে তৃতীয় ইনিংসে সরকারি সংস্থার বেসরকারিকরণের জোয়ার আনতে চলেছে মোদি সরকার। যাতে রাজকোষ নিয়ে উদ্বেগ দূর হয়। কয়েক বছর আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল ‘ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইন’। তার প্রথম পর্বে বিশেষ ইতিবাচক ফলাফল মেলেনি। এলআইসির শেয়ার এবং এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি করে কিছু আয় হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, সরকারি সংস্থা, সেগুলির সম্পদ ইত্যাদি বিক্রির যে তালিকা তৈরি করা হচ্ছিল, সেই কাজ থমকে গিয়েছে। এবার সেই লক্ষ্যে পুনরায় অগ্রসর হচ্ছে মোদি সরকার। শুধুমাত্র রেলের সম্পত্তি ও রেল সংস্থার শেয়ার বিক্রি করেই আড়াই লক্ষ কোটি টাকা রোজগারের টার্গেট নেওয়া হয়েছে। অর্থের প্রয়োজন এত প্রবল আকার ধারণ করেছে কেন? অন্যতম কারণ হল, আসন্ন অষ্টম পে কমিশনের রিপোর্ট। এই রিপোর্ট যখনই জমা পড়ুক না কেন, পে কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করতে হবে ২০২৬ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে। অর্থাৎ, দিতে হবে এরিয়ার। এতে মোট সাড়ে চার লক্ষ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে বলে আশঙ্কা সরকারের। দেশে কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিয়ে সরকারি কর্মী ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মচারীদের বেতন ও পেনশন দিতে ২৫ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হয়। অষ্টম বেতন কমিশনে সেই অঙ্কটা আরও বাড়বে। তাই সরকারি সংস্থা বিক্রির এত তোড়জোড়।
গোটা পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করেছে নীতি আয়োগ। তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে রেলমন্ত্রক, অর্থমন্ত্রকের ডিপার্টমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট। সেখানেই রেলমন্ত্রককে নিজেদের অধীনে থাকা যে যে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রি করা যেতে পারে, তার একটি তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে রেলের যত সম্পত্তি রয়েছে, সেগুলিকে কীভাবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং অব্যবহৃত জমি-ভবন বিক্রি কিংবা লিজ দেওয়ার সুযোগ আছে কি না ইত্যাদিও জানাতে বলা হয়েছে।
রেলের সম্পত্তি চিহ্নিত করে তালিকা নির্মাণের কাজটি যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। ১৭ জোনকেই এই মর্মে তালিকা করতে বলা হবে। অর্থমন্ত্রক সূত্রে খবর, রেলের অধীন সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণ কর্মসূচি নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে সরকারের অংশিদারিত্ব এখনও অনেক বেশি। আইআরএফসির ক্ষেত্রে সরকারের হাতে আছে ৮৭ শতাংশ শেয়ার। আইআরসিটিসির ক্ষেত্রে ৬৩ শতাংশ, রেল বিকাশ নিগমের ৭৩ শতাংশ, রাইটসের ৭৩ শতাংশ, রেলটেল এবং ইরকনের ৬৬ শতাংশ করে। সেই শেয়ারের পরিমাণ কমিয়ে ৫০-৬০ শতাংশের মধ্যে আনা হবে। সব মিলিয়ে কেন্দরীয় সরকারের হাতে রেলের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির যে পরিমাণ অংশিদারিত্ব রয়েছে, তার মূল্য অন্তত সাড়ে চার লক্ষ কোটি টাকা। তার ১৫-২০ শতাংশ বিক্রি করতে পারলে এক লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি যাওয়া অসম্ভব নয়। পাশাপাশি দেশজুড়ে রেলের যত সম্পত্তি, ভবন, জমি, পরিত্যক্ত স্টেশন, ওয়্যারহাউস, গোডাউন, আবাসন, অফিস আছে, সেগুলি বিক্রি অথবা লিজ দেওয়া যেতে পারে। নীতি আয়োগ মনে করছে, বেসরকারিকরণ করা হলে রেলের সম্পদ ম্যানেজমেন্ট অনেক ইতিবাচক হবে এবং রাজকোষও উপকৃত হবে। মোদি সরকারের কাছে নেহরু ও কংগ্রেস জমানা খারাপ। অথচ তাদের তৈরি করে রেখে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই আয়ের জন্য কেন্দ্রের একমাত্র ভরসা।