যোগে চিত্তবৃত্তির নিরোধ করা হয়। বৃত্তিগুলি একত্র করতে হয়। এর সাধারণ নাম সংযম। সূত্র হল—“ত্রয়মেকত্রসংযমঃ।” ধারণা, ধ্যান ও সমাধি—এই তিনটি যখন একত্ররূপে একই বিষয়ে প্রযুক্ত হয় তখন তাকে সংযম বলা হয়। যখন কোন বিষয়ে চিত্তকে সমাহিত করতে হয়, তখন তাকে নিজের অন্তরে নিয়ে আসতে হয়। হৃদয়ে, হার্দাকাশে বিশোকাজ্যোতির ভাবনা—অর্থাৎ হৃদয়ে জ্যোতির ভাবনা জ্যোতির একটি ক্ষেত্র (field) তৈরী করতে হয়। সেই জ্যোতির্ক্ষেত্রে বিষয় বা বস্তুর স্থাপনা করতে হয়। যেমন, ইষ্টের হৃদয়ে স্থাপনা করে যখন তাতে একত্রতা প্রবাহিত করা হয়, তখন অহং বিদূরিত হয়ে যায় আর ইষ্টের revelation বা প্রকাশ ঘটে। এই সংযমের জয়ে প্রজ্ঞালোকের দ্বার খুলে যায়। “তজ্জয়াৎ প্রজ্ঞালোকঃ।”
ব্যক্তিগত কোনও সংস্কারের অস্তিত্ব থাকা উচিত নয়। কোন বিষয়কে জানার জন্য সেই বিষয়ের ব্যাপারে এক প্রাথমিক ধারণা করে, হার্দজ্যোতি প্রকট করে, বিষয়কে সেই জ্যোতিতে স্থাপন করা দরকার, যেমন microscope-এর নীচে বস্তুকে রাখা হয়। এরপর নিজেকে সংস্কার শূন্য করে একপ্রকার তন্ময়তা আনা দরকার। অহং বা wishful thinking অর্থাৎ নিজের জাতিকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেওয়া উচিত। এই প্রকার বস্তু বা বিষয়ের স্বরূপ স্বপ্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে। যোগের প্রাথমিক অবস্থা থেকেই এই প্রকারের ভাবনার আশ্রয় করলে নিজের ভিতর যে wishful thinking রয়েছে তার খেয়াল আসবে। নিজেকে সম্পূর্ণ শূন্যবৎ করে অসম্প্রজ্ঞাত অবস্থায় নিয়ে গেলে ‘স্বরূপ শূন্যমিব অর্থমাত্র নির্ভাসং’—এই অবস্থায় বিষয় illuminated বা প্রকাশিত হয়ে যায়। একে প্রজ্ঞালোকে বা intuitivve light বলে।
এই সংযমের অবলম্বন করলে দুই প্রকার সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়—জ্ঞানের সিদ্ধি আর ক্রিয়ার সিদ্ধি। ক্রিয়াসিদ্ধিতে পতঞ্জলি অনেকপ্রকার বিভূতির বর্ণনা করেছেন। এদের মধ্যে মুখ্য সিদ্ধিগুলির ব্যাপারে কিছু বলা হচ্ছে।
“প্রত্যয়স্য পরচিত্তজ্ঞানম্।”—এ হল একপ্রকারের thought reading-এর শক্তি। এই প্রত্যয়ের উপর সংযম করলে পরচিত্তের জ্ঞান সম্ভবপর হতে পারে। সামান্য অভ্যাস দ্বারা এই thought-reading-কে আয়ত্তকরা যেতে পারে। কোন ব্যক্তির অঙ্গ বা মুখাদি দর্শনে যে মনোভাব প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে তাকেই প্রত্যয় বলা হয়। এমন করেই কোন প্রত্যয়ের অবলম্বন করে পূর্ববর্ণিত পন্থার অনুসারে সেই প্রত্যয়কে হার্দজ্যোতিতে স্থাপিত করে স্বয়ং সংস্কারশূন্য হলে স্বতঃ thought reading হয়ে যায়। স্বচ্ছ কাচের ভিতর যেমন জ্যোতিদর্শন সম্ভব হয়, তেমনই অপরের হৃদয় প্রতিভাত হয়। এর উপরন্তু telepathy-র শক্তির বিকাশ হতে পারে। অবশ্য এই সকলের জন্য অনুশীলনের যথেষ্ট আবশ্যকতা রয়েছে।



