Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

মিনারুলের ধর্মকথা শুনতে ভিড় করত গ্রামবাসী

মিনারুলের ধর্মকথা শুনতে ভিড় করত গ্রামবাসী
  • ২০ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
নিজস্ব প্রতিনিধি, হরিহরপাড়া: তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। আজমতপুর গ্রামের বাসিন্দারা লেপ-কাঁথার নীচে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ভাঙা ইট ও সুরকির রাস্তা দিয়ে প্রায় নিঃশব্দে গ্রামে ঢুকে পড়ল ১২টি গাড়ি। প্রতিটি গাড়িতে ভর্তি সশস্ত্র পুলিস। গ্রামে ঢুকে সশস্ত্র পুলিস বাহিনী ঘিরে ফেলল একটি বাড়ি। কয়েকবার ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া না পাওয়ায় গ্রিলের গেট ভেঙে তারা সোজা ঢুকে যায় বাড়ির ভিতরে। সেখান থেকে বাড়ির মালিক বছর চল্লিশের মিনারুল শেখকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ, মিনারুল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ’ বা জেএমবির সদস্য। বুধবার ভোর তিনটে নাগাদ হরিহরপাড়ার গ্রামে এই অপারেশন চালায় অসম রাইফেলস ও রাজ্য পুলিসের এসটিএফ। এতটাই সন্তর্পণে তারা কাজ সারে যে, গ্রামবাসীরা কিছু টেরই পাননি। 
Advertisement
গ্রামের এক মহিলা দোকানি জানালেন, তাঁরা ঘুম ভাঙার পর গোটা ঘটনাটি শুনে স্তম্ভিত। কারণ, গ্রামের মানুষরা মিনারুলকে নিপাট ভালোমানুষ বলেই জানত। সে মাঠেঘাটে কাজ করত। তবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়া মিনারুলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি ও সারানোর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। তার হাতের কাজ এতটাই সূক্ষ্ম যে, তাবড় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররাও হার মানতে পারে। গ্রামের কোনও ট্রাক্টর, জলের পাম্প, মোটর, ধানঝাড়া মেশিন খারাপ হলেই ডাক পড়ত মিনারুলের। নিমেষের মধ্যে সেসব সারাই করে দিত। তাই মিনারুলের বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। আর সেই সুযোগে গ্রামের অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের মগজধোলাই করত সে। পড়াশোনা না জানলেও, কথা বলে অন্যকে বশ করতে ওস্তাদ সে। নিয়ম করে বিভিন্ন ধর্মসভায় যেত। 
মিনারুলের এই কারিগরি দক্ষতার কথা জেনে অবাক পুলিসও। বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের স্লিপার সেলের হয়ে সংগঠন বিস্তারের কাজের পাশাপাশি তাকে দিয়ে বিশেষ কোনও যন্ত্রপাতি তৈরির পরিকল্পনা ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। মিনারুলের বাড়ির দু’টি ঘর, ছাদ ও বারান্দায় দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি চালিয়েছে অসম পুলিস ও এসটিএফ। তার বাড়িতে মজুত করা প্রচুর যন্ত্রপাতি ঘেঁটে দেখে সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানরা। বেশ কিছু নথিপত্র, মোবাইল ফোন ও তার স্ত্রীর ব্যাঙ্কের পাসবই বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিস। 
স্থানীয় এক বৃদ্ধ বলেন, ধর্মের ব্যাপারে মিনারুলের অসাধারণ জ্ঞান ছিল। একটু অন্য রকমের কথাবার্তা বলত। সবাই মন দিয়ে শুনত সেসব কথা। আমরা খুব অবাক হয়ে যেতাম যে, এই গ্রামে থেকে সামান্য পড়াশোনা করে ধর্মের ব্যাপারে এত গভীর জ্ঞান তার কী করে হতে পারে। এখন তো শুনছি অন্য কথা। 
মিনারুলের স্ত্রী টগোরা বিবি বলেন, আমাদের ১৭ বছর আগে বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে এবার মাধ্যমিক দেবে। ছোট ছেলের বয়স ১৩। ওদের কথা একবারও ভাবল না। খেতে কাজের পাশাপাশি বাড়িতে যন্ত্রাংশ কিনে এনে জল তোলার পাম্প তৈরি করত। আমাকে মাঝে মধ্যেই বলত, একটা মাদ্রাসা খুলবে। হরিহরপাড়ার খিদিরপুরের দিকে মাদ্রাসা তৈরির জন্য একটা জমিও দেখেছিল সে। 
মিনারুলের মা আসমা বিবি বলেন, কেন ওকে ধরে নিয়ে গেল বুঝতে পারছি না। আমার ছেলে কিছুই করেনি। ও মাঠেঘাটে কাজ করার পাশাপাশি বাড়িতে টুলু পাম্প তৈরি করত। গ্রামের সকলের সঙ্গে সদ্ভাব ছিল। আগে কখনও পুলিসের খাতায় ওর নাম ওঠেনি। এত পুলিস এসে রাতের অন্ধকারে কেন যে কেন ওকে ধরে নিয়ে গেল বুঝতে পারছি না। বাবা ইমাজউদ্দিন শেখ বলেন, ছোটবেলায় মিনারুলকে নিয়ে পাশের গ্রাম থেকে এখানে চলে আসি। আমার দুই ছেলে পাশাপাশি থাকে। মিনারুল বড়। ছোট ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। ওইদিন রাতে প্রচুর পুলিস বড় বড় বন্দুক নিয়ে বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল। রাতের অন্ধকারে আমরা পাশের বাড়ি থেকে কিছুই দেখতে পারছিলাম না। তারপর ওকে তুলে নিয়ে চলে গেল। আমাদের কিছুই বলেনি পুলিস।
সম্পর্কিত সংবাদ