নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: নবমীর সকালে ধুনোর ধোঁয়ায় ভরে ওঠে বারোয়ারি চত্বর। সেইসঙ্গে শোনা যায় আকাশভেদী ঢাকের আওয়াজ। জগদ্ধাত্রীর জগতে যেন প্রলয় ওঠে। আর সেই দৃশ্য দেখতেই বহু দর্শনার্থী ভিড় করেন মালোপাড়া বারোয়ারিতে। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির সমসাময়িক এই পুজোতে দেবী জগদ্ধাত্রী পূজিত হন মা জলেশ্বরী নামে। পুজোর সময় ওখানে ধুনো পোড়ানো রীতি রয়েছে। দেবীর সামনেই কয়েক কেজি ধুনো পোড়ানো হয় প্রতিবছর। এই পুরনো রীতি শহরের বাকি পুজোগুলির থেকে মালোপাড়া বারোয়ারিকে আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে। চলতি বছরে রেকর্ড পরিমাণ, ৫১ কেজি ধুনো পোড়ানো হবে মালোপাড়া বারোয়ারিতে। এর আগে এই বিপুল পরিমাণ ধুনো কখনও পোড়ানো হয়নি বলে দাবি করছেন বারোয়ারির সদস্যরা। যেখানে গতবছর ৪০ কেজি ধুনো পোড়ানো হয়েছিল। সেই ধুনোর গাঢ় ধোঁয়া ভেদ করেই ফুটে ওঠে সাবেকিআনার সাজে সজ্জিত দেবীর স্নিগ্ধ মুখ। মালোপাড়া বারোয়ারির বর্তমান সম্পাদক শ্যামল হলদার বলেন, যাঁদের মানত করা থাকে তাঁরাই ধুনো দেন। কারোর কোনও বাধ্যবাধকতা থাকে না যে কত ধুনো দিতে হবে। যাঁরা ধুনো দেন তাঁদের নাম নথিভুক্ত করা হয়। সেইমতো ধুনো পোড়ানোর সময় তাঁরা ধুনো দিয়ে যান। এবছর প্রায় ৫১ কেজি ধুনো পোড়ানো হবে।কৃষ্ণনগর শহরের অন্যতম প্রাচীন পুজো হল মালোপাড়া বারোয়ারির পুজো। শোনা যায়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করার কিছু বছর পরেই মালোপাড়ার মালোদের উদ্যোগে জলেশ্বরী মাতার পুজো শুরু হয়। তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র পুজো করার জন্য মালোপাড়া বারোয়ারিকে ১৫ টাকা দিয়েছিলেন। বর্তমানে এই টাকার অঙ্ক কম মনে হলেও তৎকালীন সময়ে তা ছিল অনেক বেশি। পুরোনো রীতি মেনে এখনও রাজবাড়ি থেকে মালোপাড়া বারোয়ারিতে ১৫ টাকা আসে। কৃষ্ণনগর শহরের শতাব্দী প্রাচীন এই পুজোতে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অবদান অনস্বীকার্য। কথিত আছে, বন্দিদশা কাটিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ফিরে এসে মা উমাকে জগদ্ধাত্রীর রূপে পুজো করেছিলেন। সেই থেকেই বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন। রাজবাড়ির দেবী রাজ রাজেশ্বরীকে জলঙ্গী নদীতে বিসর্জনের জন্য ডাকা হতো মালোপাড়ার মালোদের। জগদ্ধাত্রীকে দোলনায় করে মালোরা ভাসান দিতে নিয়ে যেতেন। তারপর জোড়া নৌকার মাঝখানে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হতো। একবার মালোরা রাজার কাছে আবদার করেন যে তাঁরাও জগদ্ধাত্রী পুজো করতে চান। ধর্মপরায়ণ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাতে আপত্তি জানাযননি। কিন্তু পুজোর আয়োজনে তো অনেক খরচ। এতটাকা আসবে কোথা থেকে? শেষ পর্যন্ত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র পুজোর আয়োজনের জন্য ১৫ টাকা দিয়েছিলেন।কৃষ্ণনগরের ইতিহাস গবেষক সুপ্রতিম সরকার বলে, মালোপাড়া বারোয়ারির পুজো শহরের সবচেয়ে পুরাতন পুজো।



