Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মূল দায় জনবিরোধী অর্থনীতির

মূল দায় জনবিরোধী অর্থনীতির
  • ৫ মার্চ, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
রাজ্যে আবার একটি বড় মাপের আর্থিক প্রতারণার ঘটনা সামনে এল। অভিযোগ অনুসারে, শেয়ার ও ক্রিপ্টো কারেন্সিতে টাকা খাটিয়ে তাড়াতাড়ি বেশি লাভ ঘরে তোলার টোপ দিয়েই সাধারণ মানুষের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছে একটি চক্র। একটি বেসরকারি অর্থলগ্নি সংস্থার নাম করে এইভাবে ৭০০ কোটি টাকা তোলা হয়েছে বলে খবর! আর তারপরই ওই কোম্পানির ‘কীর্তিমান’ কর্ণধার তাঁর এক বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে তল্পিতল্পাসমেত নিপাত্তা। শোনা যাচ্ছে, শুভ্রকান্তি নাগ নামে ওই ‘গুণধর’ দেশ ছেড়েই পালিয়ে গিয়েছেন।  তাঁদের সঙ্গে ফেরার ওই সংস্থার অন্য ১১ জন ডিরেক্টরও। পুলিস অভিযোগ পেয়েছে, এই চক্রের হাতে প্রতারিত হয়েছেন মোট প্রায় ৫০ হাজার আমানতকারী। বিনিয়োগের নামে নিপুণ হাতে ‘লুটপাট’ শেষে এই চক্রের পান্ডারা পাড়ি দিয়েছেন দুবাই। রাজ্য পুলিসের ডিরেক্টরেট অব ইকনমিক অফেন্সেস (ডিইও) এই সংক্রান্ত অভিযোগ পেয়ে গত ২৮ জানুয়ারি তদন্ত শুরু করেছে। তবে তার আগেই শুভ্রকান্তি সবান্ধবে মোচ্ছবে মেতেছেন ভোগবিলাসের নয়া স্বর্গ দুবাইতে গিয়ে। 
Advertisement
ফেরার অভিযুক্তদের রাজ্যে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে মরিয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিস। এজন্য গুণধরদের পাসপোর্ট নম্বর জোগাড় করেছে ডিইও। এবার ‘রেড কর্নার’ নোটিস জারির জন্য ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হচ্ছে তারা। তদন্তকারী সংস্থার তরফে দেশের সমস্ত বিমানবন্দরে অভিযুক্তদের পাসপোর্টের নথি পাঠানো হয়েছে। বস্তুত, সারদা-রোজভ্যালির বাহারি নামের একগুচ্ছ সঞ্চয় প্রকল্প মারফত দেড় দশক আগে বাংলাসহ নানা স্থানের হাজার হাজার মানুষকে বিপুল আর্থিক প্রতারণা করা হয়। এই জোড়া স্ক্যাম বাংলার রাজনীতিকে উত্তপ্ত রেখেছিল দীর্ঘদিন। ইস্যু দুটি পুরোপুরি চাপা পড়েনি এখনও। আর একটি বিধানসভা নির্বাচনের আগে মাথা তুলল নতুন এই কেলেঙ্কারি। ডিইও সূত্রের খবর, শুভ্রকান্তি প্রথমে একটি কোম্পানির বিনিয়োগ সম্পর্কিত সামান্য পরামর্শদাতা ছিলেন। তারপর নিজেই হয়ে ওঠেন ‘শেয়ার গুরু’। খোলেন নিজের সংস্থাও। ধীরে ধীরে মোট ২৫টি কোম্পানি খুলে চলে তাঁদের মারাত্মক প্রতারণার কারবার। নদীয়ার দুই স্থানে এই ফাঁদের প্রথম অফিস চালু হয়। পরে সংস্থার দপ্তর ডালপালা মেলে রাজ্যের অন্য একাধিক জেলাতেও। শেয়ারে বিনিয়োগের নামে টাকা তোলা শুরু হয় বছর পাঁচেক আগে। সোশ্যাল মিডিয়া মারফত ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হতো বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার সম্পর্কিত খবর। সেসব বাস্তব ভেবেই ‘লগ্নি’ শুরু করেন বহু ভাগ্যান্বেষী মানুষ। এজেন্ট ও লগ্নিকারীদের ‘বুস্ট আপ’ করার জন্য প্রতিবছর জমকালো ‘বিজনেস মিট’ হতো। দেখানো হতো দুবাইতে ব্যবসা করারও প্রলোভন। ব্যবসা বিস্তৃত হয় ক্রিপ্টোকারেন্সিতেও। উদ্দেশ্যে একটাই, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ ‘আত্মসাৎ’ করে রাতারাতি ধনাঢ্য বনে যাওয়া। ডিইও’তে দায়ের হওয়া অভিযোগ অনুসারে, বস্তুত হয়েছে সেটাই। কেননা, বাজার থেকে তোলা বিপুল অর্থ কোথাও বিনিয়োগই করা হয়নি! কোম্পানির অফিস এবং ডিরেক্টরদের বাড়িসহ নানা স্থানে তল্লাশি চালিয়ে বাজেয়াপ্ত করা নথি থেকেই ডিইও কর্তারা এমনটাই মনে করছেন। 
শুভ্রকান্তি অ্যান্ড কোং-এর এত বড় ‘কীর্তি’ রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থার গোচরে এসেছে অতিসম্প্রতি। যেকোনও কেলেঙ্কারি, শুরুতে হিমশৈলের চূড়ামাত্ররূপে মুখ তোলে। কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে শেষমেশ যা আবিষ্কৃত হয় তা সাক্ষাৎ কেউটেই! তাই নয়া কেলেঙ্কারিকে ছোট বা মাঝারি ভেবে নেওয়ার অবকাশ আপাতত নেই। রাজ্য পুলিসের অর্থনৈতিক অপরাধ দমন বিভাগ (ডিইও), আশা করা যায়, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই এই রহস্যের জাল গোটাবে এবং প্রকৃত দোষীদের পেশ করবে আদালতে। তবে, এ কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অভাব থেকেই এদেশের সাধারণ মানুষ তাঁদের কষ্টার্জিত কিছু টাকা সঞ্চয় করেন। কিন্তু ব্যাঙ্ক এবং ডাকঘরের মতো নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পগুলিতে সুদের হার ভীষণ কম হওয়ায় কিছু মানুষ প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেন। এই কাণ্ড উপর্যুপরি এবং নানাভাবে ঘটে চলেছে। তাই দায়টি কেন্দ্রীয় সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। বস্তুত মোদি সরকারের জনবিরোধী অর্থনীতিই এই পাপের মূলে। মানুষ আর কতভাবে এবং কতটা সর্বস্বান্ত হওয়ার পর মোদি সরকারের সংবিৎ ফিরবে? ‘জনগণের দ্বারা নির্বাচিত’ বলে আত্মশ্লাঘা অনুভব করার সঙ্গে সরকারকে ‘জনগণের জন্য’ হয়ে ওঠাও যে জরুরি—এই দায়িত্ববোধ বিস্মৃত হয়েছেন দিল্লিওয়ালারা!
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ