দুর্বাদল দাস, ঝালদা: কানে শুনতে পান না ঠিকমতো। দু’পায়ে চলার ক্ষমতা নেই। স্রেফ মনের জোর আর দলের প্রতি আবেগ তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি ঘরের কোণে। তিনি মিঠু কর্মকার। পুরুলিয়ার জয়পুর বিধানসভার বামনিয়ার বাসিন্দা। শুক্রবার যখন জয়পুরের বামনিয়া ডাকবাংলো ময়দানে চাঁদিফাটা রোদ। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপেক্ষায় উত্তাল। রাস্তা দিয়ে ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে একটি হুইলচেয়ার। মিঠুর বাড়ি থেকে ডাকবাংলো ময়দানের দূরত্ব তিন কিলোমিটার। নিজের হাতে চাকা ঘুরিয়ে সভাস্থলে এলেন মিঠু। লক্ষ্য একটাই, প্রিয় দলের নেতাকে একবার চোখের দেখা দেখা।
মিঠু হুইলচেয়ারটি পেয়েছিলেন ব্লক প্রশাসনের তরফে। সেটাই এখন নিত্যসঙ্গী। তা নিয়েই এদিন তিনি হাজির হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী অর্জুন মাহাতোর সমর্থনে আয়োজিত জনসভায়। কানে শুনতে পান না বলে প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে খানিকটা সমস্যা হয়। কিন্তু নিজের আবেগের কথা জানিয়ে যান অনর্গল। আকার-ইঙ্গিতে আর ভাঙা ভাঙা গলায় মিঠু জানান, তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি এই ঝান্ডা ধরে রয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘যখন দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) গাছের তলায় সভা করতেন, তখন থেকে আমি দল করি। আজ আমাদের বড় নেতা আসছেন, কষ্ট হলেও তাঁকে দেখতে যাবই। এটাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।’
তবে এই একনিষ্ঠ দলীয় কর্মীর মনে এক চিলতে আক্ষেপও রয়েছে। দীর্ঘ পথ সাধারণ হুইলচেয়ারে যাতায়াত করতে করতে তাঁর শরীর আর সায় দিচ্ছে না। তাই নেতৃত্বের কাছে তাঁর কাতর আবেদন, যদি একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তবে অন্তত শেষ বয়সে যাতায়াতে কিছুটা সুবিধা পেতেন তিনি। এ বিষয়ে জয়পুর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী অর্জুন মাহাতো বলেন, ‘মিঠু কর্মকার আমাদের দলের একনিষ্ঠ সৈনিক। ওঁর মতো মানুষদের আশীর্বাদ রয়েছে বলেই তৃণমূল আজও মানুষের হৃদয়ে। ওঁর শারীরিক সমস্যার কথা আমরা জানি। ব্লক থেকে আগে একটি হুইলচেয়ার দেওয়া হয়েছিল। এখন ওঁর একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার প্রয়োজন। আমি কথা দিচ্ছি, ব্যক্তিগতস্তরে চেষ্টা করে ওঁর এই দাবি আমি মেটাব।’
রাজনীতির ময়দানে যখন লাভ-ক্ষতির হিসেব কষা হয়, তখন মিঠু কর্মকারের মতো নিঃস্বার্থ কর্মীরাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ভালোবাসা ও আনুগত্য কোনো প্রতিবন্ধকতাই মানে না। বামনিয়ার ময়দানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতার ভিড়ে মিঠু হয়তো এক সাধারণ মুখ। কিন্তু তাঁর এই লড়াই তৃণমূল শিবিরের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা। • নিজস্ব চিত্র