সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতারই বাস্তব রূপ ধরা পড়ল ট্রেনযাত্রী নাবালকদের কথায়। ওদের কারও বয়স ১৪, কারও ১৫বছর। বিহারের জেমুই থেকে দু’মুঠো অন্ন জোগাড়ের জন্য চেন্নাইয়ে কাজে যাচ্ছিল। নাবালকদের শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করাতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে বুধবার আসানসোল স্টেশনে অভিযান চলে। সেখানেই একের পর এক নাবালক উদ্ধার হতে থাকে। তাদের কথা শুনে চোখে জল আসে আরপিএফ, জিআরপি অফিসারদের। এই ছবি ডাবল ইঞ্জিনের সরকারের আমলের বিহারের। জানা গিয়েছে, নাবালকদের থেকে পাওয়া আধার কার্ড যাচাই করে দেখেছেন তদন্তকারীরা। কিন্তু, তা থেকে কোনও তথ্যই বের হচ্ছে না। তদন্তকারীদের সন্দেহ, বয়স বাড়াতেই আধার কার্ডে কোনও কারচুপি করা হচ্ছে। যা নিয়ে জোর কদমে চলছে তদন্ত। এখনও পর্যন্ত নাবালকদের পাচার করার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। চলতি বছরেই বিহারে নির্বাচন। নীতীশ কুমারের সঙ্গে জোট বেঁধে বিহার শাসন করছে বিজেপি। ডাবল ইঞ্জিনের উন্নয়নের প্রচারে আসছেন প্রধানমন্ত্রীও। এই অবস্থায় বিহারের অর্থনীতির কঙ্কালসার দশা বেরিয়ে এসেছে বুধবারের ঘটনায়। আরপিএফ ও জিআরপির কাছে অভিযোগ আসে, চেন্নাইগামী ট্রেনে প্রচুর নাবালককে শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বুধবার জসিডি-তাম্বারাম উইকলি সুপারফাস্ট ট্রেনটি আসানসোলে আসতেই শুরু হয় তল্লাশি। কাঠফাটা গরমেই জেনারেল কামারায় গাদাগাদি করে শ্রমিকদের চেন্নাইয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। নাবালক সন্দেহ হওয়া শ্রমিকদের আলাদা করে পুলিস। তাদের সঙ্গে থাকা লোকজনদেরও আটক করা হয়। উদ্ধার হয় বিহারের লক্ষ্মীসারই ও জেমুইয়ের বাসিন্দা সাত নাবালক। পাশাপাশি ঝাড়খণ্ডের তিনজন ও বাংলার একজন নাবালক শ্রমিকেরও সন্ধান মেলে। আধার কার্ড অনুযায়ী তাদের বয়স ১৪-১৫বছর। তবে, চাক্ষুষ দেখে তাদের বয়স আরও কম বলেই মনে হয়েছে। তদন্তকারীরা আধার যাচাই করার চেষ্টা করেও তা থেকে কোনও তথ্য পাননি। তাই নাবালকদের পরিবারের লোকজনকে জন্ম শংসাপত্র নিয়ে আসার অনুরোধ করা হয়েছে। আরপিএফের সন্দেহ, যারা আধার কার্ড দেখিয়ে নিজেদের সাবালক বলে পার পেয়ে গিয়েছে, তাদের অনেককেই দেখে নাবালক মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে খুব সম্ভবত আধারে কারচুপি করে বয়স বাড়ানো হয়েছে।
আর এখান থেকেই বিহারের অর্থনীতির করুণ দশা সামনে এসেছে। জানা গিয়েছে, দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির দালাল নাবালকদেরও চেন্নাইয়ে কাজ করাতে নিয়ে যাচ্ছে। এহেন পাঁচজনকে জিআরপি গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে দু’জন বিহারের জেমুইয়ের, একজন ঝাড়খণ্ডের দেওঘরের ও অন্যজন বীরভূমের কীর্ণাহারের বাসিন্দা। তৃণমূল রাজ্য সম্পাদক ভি শিবদাসন দাসু বলেন, বিজেপি বিহারে কোনও উন্নয়ন করেনি। প্রকৃত উন্নয়ন করলে মানুষ কেন তাঁদের নাবালক সন্তানকে বাইরে কাজ করতে পাঠাবেন? বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি দিলীপ দে বলেন, পরিবারগুলিকে ভুল বুঝিয়ে নাবালকদের পাচার করা হচ্ছিল কি না, তা দেখতে হবে। বিহারে এখন আর্থিক অবস্থা ভালো।
আসানসোল স্টেশনে ধৃতরা।-নিজস্ব চিত্র