পি চিদম্বরম: গত সপ্তাহে সংসদের উভয় কক্ষে বিতর্কের সময়, সরকার এই ধারণা দিয়েছিল যে ‘অপারেশন সিন্দুর’ অবশেষে স্থগিত রাখা হয়েছে। অর্জিত হয়েছে আমাদের লক্ষ্য এবং এটি এসেছে স্বাভাবিকভাবেই। এই ভাবনাটা ভুল। সত্যটা হল, অসামরিক সরকার বল জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার ফলে সামরিক বাহিনীকে একটি কঠিন খেলা খেলতে হচ্ছিল। অপারেশন সিন্দুর কিছু মিথ ভেঙে দিয়েছে। যেমন—পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সহজ। প্রচলিত যুদ্ধে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ভারতই জিতবে। ভারতের অনেক বন্ধু আছে আর পাকিস্তান একটি নির্বান্ধব দেশ! সামরিক বনাম রাজনৈতিক
সামরিক নেতৃত্ব অনুকরণীয় ছিল। দৃশ্যত তারা যুদ্ধ করার স্বাধীনতা চেয়েছিল এবং তা পেয়েছিল। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ‘ফার্স্ট-মুভার অ্যাডভানটেজ’ তাদের প্রাথমিক জয়টা এনে দিয়েছিল। সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল যে ৯টি স্থানে, ধ্বংস করা হয়েছিল সেগুলি। আর ওই আঘাত হানার সময়ে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসবাদী দুর্বৃত্ত নিহত হয়েছিল। তবে, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ঘুরেও দাঁড়িয়েছিল দ্রুত। তারা পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছিল ৭-৮ মে। পাকিস্তান এজন্য ব্যবহার করেছিল চীনের তৈরি বিমান (জে-১০), চীনের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র (পিএল-১৫) এবং তুর্কি থেকে কেনা ড্রোন।
‘কৌশলগত ভুল’ হয়েছে বুঝতে পেরেই ভারতের সামরিক নেতৃত্ব অভিযান থামিয়ে কৌশল বদল করে। এটাই নেতৃত্ব। তারা ৯-১০ মে নতুনভাবে অভিযান শুরু করে এবং পাকিস্তানের ১১টি সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা শানায়। তাতে পাকিস্তানের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এই যুদ্ধে অনিবার্যভাবেই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর কিছু ‘ক্ষতি’ হয়েছিল। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ এবং ডেপুটি চিফ অফ আর্মি স্টাফ আমাদের এই ক্ষয়ক্ষতির বাস্তবটা স্বীকারও করে নেন। এটাও নেতৃত্ব।
আর এখানেই বৈপরীত্য ধরা পড়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থানে। তারা ভুল বা ক্ষতি স্বীকার করবেন না। এটা সেই উটপাখির মতো, যে বালিতে মুখ গুঁজে দাবি করে, অপারেশন সিন্দুরে ভারত ‘ডিসিসিভ ভিক্ট্রি’ বা ‘নির্ণায়ক বিজয়’ অর্জন করেছে। যদি কোনও নির্ণায়ক বিজয় হয়ে থাকে তবে কেন ভারত তার সুবিধা গ্রহণের জন্য চাপ দেয়নি? কেন নিশ্চিত করেনি দেশের জন্য আরও সামরিক লাভ? কেন পাকিস্তানের কাছ থেকে রাজনৈতিক ছাড় দাবি করেনি এবং গ্রহণ করেনি? পাকিস্তানের ডিজিএমও’র প্রথম প্রচার (ফার্স্ট আউটরিচ) কেন তৎক্ষণাৎ এবং কোনও শর্ত ছাড়াই গ্রহণ করা হয়েছিল? সরকারের পক্ষ থেকে কোনও উত্তর ছিল না। [১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার কাছে পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের ঘটনাটি হল ভারতের নির্ণায়ক বিজয়ের একটি উজ্জ্বল নজির।
কঠোর বাস্তবতা রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বাস্তবতা স্বীকার করবেন না যে, পাকিস্তান এবং চীনের মধ্যে একটি শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক বন্ধন তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানকে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে চীন। পরিষ্কার হচ্ছে যে, চীন তাদের সমরসরঞ্জাম বাস্তবের যুদ্ধক্ষেত্রেই পরীক্ষা করে নিল। এই দুই দেশের ‘মিলিটারি বন্ড’ বা সামরিক মিত্রতার বন্ধন দৃশ্যমান হল। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দৃঢ় পদক্ষেপের’ প্রশংসা করেছেন চীনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ), বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক (এডিবি) যখন পাকিস্তানকে বিপুল পরিমাণ ঋণ মঞ্জুর করেছিল তখন চীনও তার পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
অন্য বাস্তবতা হল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের (অন্তত পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর) বন্ধন বহাল রয়েছে দৃঢ়ভাবেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন! অথচ মুনির কোনও রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান নন। এমন একজন ব্যক্তিকে এই আমন্ত্রণ এক অভূতপূর্ব সম্মান। ‘যুদ্ধে না-যাওয়ার জন্য এবং যুদ্ধটা শেষ করার জন্য’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেনারেল মুনিরকে ধন্যবাদ জানান। এমনকী, ট্রাম্প এই আনন্দও প্রকাশ করেন যে তিনিই যুদ্ধবিরতি এনেছেন।
প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে বিরোধীদের তিরস্কার করার সুযোগ হাতছাড়া করেন না। আবার তাঁরাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কিংবা তাঁদের বিদেশমন্ত্রীদের দাবি খারিজ কিংবা খণ্ডন করার সাহস দেখান না।
চরম বাস্তব এটাই যে সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের অবস্থান অবিকল! তাদের পার্থক্যগুলি বাদ দিয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পাকিস্তানকে সমর্থন এবং পৃষ্ঠপোষকতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরও খারাপ বিষয় হল, ভারত যেসব দেশে গিয়েছে তারা পহেলগাঁও হামলার ভিকটিমদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদেরও নিন্দা করেছে। কিন্তু পাকিস্তান অপরাধ করেছে, এই মর্মে নিন্দা করেনি কোনও দেশই। ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বাস্তবতা মেনে নিতে অস্বীকার করে চলেছে। তারা মনে এই মিথ্যা বিশ্বাসও লালন করে চলেছে যে, পাকিস্তান একটি বন্ধুহীন দেশ এবং ভারতের মিত্র রয়েছে সারা বিশ্বেই।
অনুপ্রবেশকারী এবং ভারত-ভিত্তিকভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের আর একটি ভ্রান্ত ধারণা হল, জম্মু ও কাশ্মীরে ‘টেটর ইকোসিস্টেম’ বা ‘সন্ত্রাসের পরিবেশ’ ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিন্তু সত্যটা ভিন্ন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক গত ২৪ এপ্রিল (২২ এপ্রিল পহেলগাঁও হামলার পরপরই) এক সর্বদলীয় বৈঠকে জানায় যে, ২০১৪ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে—
• ১৬৪৩টি সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটেছে,
• ১৯২৫টি অনুপ্রবেশের চেষ্টা হয়েছে,
• সফল অনুপ্রবেশের ঘটনা হয়েছে ৭২৬টি এবং
• ৫৭৬ জন ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন।
অস্বীকার করা যাবে না যে অটলবিহারী বাজপেয়ি (১৯৯৮-২০০৪) এবং মনমোহন সিং (২০০৪-২০১৪) জমনোতেও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল।
সন্ত্রাসের পরিবেশে, বিশেষ করে কাশ্মীরে—পাকিস্তান-ভিত্তিক অনুপ্রবেশকারী এবং ভারত-ভিত্তিক জঙ্গিদের দাপট জারি রয়েছে। প্রায়ই তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, একসঙ্গে আক্রমণ করে এবং সাহায্য করে একে অপরকে। ‘পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের’ কাশ্মীরে বেশ কয়েকটি বাড়ি গত ২৬ এপ্রিল সরকার গুঁড়িয়ে দেয়। স্পষ্টতই ওইসব মালিকরা ছিল ভারত-ভিত্তিক। ২০২৫ সালের জুন মাসে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) দু’জন ভারতীয় লোককে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের গত ২৭-২৮ জুলাই ‘নিষ্ক্রিয়’ করার পাশাপাশি ‘অনুপ্রবেশকারী’ দেগে দেওয়া হয়েছিল।
ভারত-ভিত্তিক জঙ্গিরা অতীতে সন্ত্রাসবাদী হামলা করেছে। উদাহরণ হিসেবে ২০০৬ সালে মুম্বইতে সন্ত্রাসবাদী হামলা (শহরতলির ট্রেনে বোমা বিস্ফোরণ), ২০০৮ সালে তাজমহল হোটেলে হামলা এবং ২০১১ সালে জাভেরি বাজারে হামলা উল্লেখযোগ্য। ২০০৬ সালের ঘটনাটি ছিল ভারত-ভিত্তিক সন্ত্রাসবাদীদের ‘কীর্তি’! অন্যদিকে, ২০০৮ সালের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল কাসব-সহ ১০ জন পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারী। ২০১১ সালের ঘটনাটি ছিল ভারত-ভিত্তিক সন্ত্রাসবাদীদের কাণ্ড। ভারতে সন্ত্রাসবাদী বাস্তুতন্ত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে যে দাবি সরকারের তরফে করা হচ্ছে, তা স্পষ্টতই ভুল।
গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা এবং পহেলগাঁওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অনুপস্থিতি এই মর্মান্তিক ঘটনার কারণ। অথচ মোদি সরকারের কেউই এর দায়িত্ব নেননি। অপারেশন সিন্দুর-এ ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সাফল্য পাকিস্তানের মনোবল কিছুটা
ভেঙে দিতে পারলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সামনে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভীরুতায় তা খারিজ হয়ে যায়। এই ঘটনা পাকিস্তানকে উৎসাহিত করতে পারে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত