প্রাচীন এক পাতালপুরীর খোঁজ মিলেছে মেক্সিকোতে। মাটির নীচে পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এক বিরাট সমাধিক্ষেত্র। জ্যাপোটেক সভ্যতার সেই কাহিনি শোনালেন শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রাচীন এক পাতালপুরীর খোঁজ মিলেছে মেক্সিকোতে। মাটির নীচে পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এক বিরাট সমাধিক্ষেত্র। জ্যাপোটেক সভ্যতার সেই কাহিনি শোনালেন শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছোট্ট বন্ধুরা তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছ, আমরা যে মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াই, দৌড়াই কিংবা ফুটবল খেলি ঠিক তার কয়েক ফুট নীচেই যদি লুকিয়ে থাকে প্রায় ১৪০০ বছর আগের এক পুরানো সভ্যতা, যেখানে দেওয়ালে দেওয়ালে লাল রঙের ছবি আর মেঝেতে বিছানো রয়েছে অনেক হীরে-জহরত, তাহলে কীরকম হবে ব্যাপারখানা? গল্প মনে হলেও ঘটনাটা সত্যি। সম্প্রতি মেক্সিকোয় প্রত্নতাত্ত্বিকরা এমন এক রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের খবর দিয়েছেন, যা সিনেমাকেও হার মানাবে।
কল্পনা কর একদল মানুষ, যারা নিজেদের ভাবত ‘মেঘের সন্তান’। তারা পাহাড়ের মাথায় শহর বানাত, আর মাটির নীচে তৈরি করত এমন এক রহস্যময় গোলকধাঁধা যা আজ কয়েক হাজার বছর পরেও আধুনিক মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে।
মেক্সিকোর এই প্রাচীন সভ্যতার মানুষদের বলা হয় জ্যাপোটেক। তবে তারা নিজেদের এক দারুণ নামে ডাকত— ‘বিন জিজা’, যার অর্থ হল ‘মেঘের দেশের মানুষ’। তারা বিশ্বাস করত যে তারা কোনো সাধারণ মানুষ নয়, বরং আকাশ থেকে মেঘ চিরে সরাসরি পাহাড়ের চূড়ায় নেমে এসেছিল।
মেক্সিকোর দক্ষিণ-পশ্চিম ওক্সাকা উপত্যকায় এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। জ্যাপোটেকরা ছিল মেক্সিকোর আসল ‘কুল’ সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা পাহাড়ের মাথা সমান করে কেটে সেখানে শহর বানাত, যাতে সরাসরি মেঘেদের সঙ্গে গল্প করা যায়। আর তাদের নাম শুনলে তোমাদের হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যাবে! জ্যাপোটেকরা ক্যালেন্ডার দেখে নাম রাখত। যদি তোমার জন্ম ওদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ‘৫-খরগোশ’ দিনে হয়, তবে তোমার নাম হবে ‘৫-খরগোশ’! ভাব তো, তোমাদের ক্লাস টিচার বকছেন, ‘এই যে ৩-কুমির আর ৮-হরিণ, কথা বলা বন্ধ করে ক্লাসে মন দাও!’ শুনতে কী মজাদার হত, তাই না?
মেক্সিকোর মিটলা নামক জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিকরা মাটির নীচে জ্যাপোটেক সম্প্রদায়ের এক বিশাল সমাধিক্ষেত্র বা পাতালপুরীর খোঁজ পেয়েছেন। জ্যাপোটেক রাজারা যখন রাজত্ব করতেন, তখন তাঁরা মাটির নীচের এই ঘরগুলোকে বলতেন ‘লিওবা’। জ্যাপোটেক ভাষায় এই সুন্দর শব্দটির অর্থ হল— ‘বিশ্রামের স্থান’।
ভাব তো, মাটির ঠিক ১৬ থেকে ২৬ ফুট নীচে (যা প্রায় একটা দোতলা বাড়ির সমান গভীর!) লুকিয়ে ছিল এক বিশাল জগৎ। জ্যাপোটেকরা মনে করত, এটা কেবল পাথরের ঘর নয়, বরং একটা পবিত্র মন্দির। সেখানে মাটির গভীরে ছিল একের পর এক সাজানো সমাধি বা ঘর, যা একটা বড়ো মাকড়সার জালের মতো একে অপরের
সঙ্গে যুক্ত।
জ্যাপোটেকরা আরো বিশ্বাস করত যে, মাটির যত গভীরে যাওয়া যাবে, দেবতাদের তত কাছাকাছি থাকা যাবে। তাই তারা তাদের প্রিয়জনদের এই শান্ত আর নিরাপদ ‘বিশ্রামের স্থানে’ রেখে আসতেন, যাতে তারা এক হাজার বছর ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। আজ যখন প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেই সুড়ঙ্গে আলো ফেলছেন, তখন যেন সেই হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস হাই তুলে জেগে উঠছে!
এই ঘরগুলো বা মন্দির-সমাধির কারুকার্য দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অবাক হয়ে গিয়েছেন। কারণ এখানকার দেওয়ালগুলো পাথরের ছোটো ছোটো টুকরো দিয়ে তৈরি, যা দেখতে একদম তোমাদের ‘লেগো’ সেটের মতো।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, এই হাজার হাজার পাথরের টুকরো জোড়া লাগাতে তারা কোনো সিমেন্ট, আঠা বা চুন ব্যবহার করেনি। পাথরগুলো শুধু চাপের মুখে একে অপরের গায়ে পাজল গেমের মতো এমনভাবে আটকে আছে যে, প্রায় ১৪০০ বছর ধরে শত শত ভূমিকম্প হলেও একটা পাথরও খসে পড়েনি। আমাদের বাড়ির দেওয়ালে যেখানে দু’বছর পর প্লাস্টার খসে পড়ে, সেখানে এই ‘পাথর-পাজল’ আজও অজেয়!
বর্তমানে ওই সমাধির ওপরে রয়েছে একটি চার্চ। আজ থেকে প্রায় ৩৫০ বছর আগেই এক খ্রিস্টান ধর্মযাজক বা মিশনারি এর হদিশ পেয়েছিলেন! তাঁর নাম ছিল ফাদার ফ্রান্সিসকো ডি বুরগোয়া।
১৬৭৪ সালে তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখে গিয়েছিলেন এক অদ্ভুত মন্দিরের কথা। তিনি লিখেছিলেন, মেক্সিকোর এক চার্চের ঠিক নীচেই মাটির তলায় আছে গভীর এক জগৎ। সেখানে চার-চারটে বিশাল ঘর আছে, যেগুলো একটা আরেকটার সঙ্গে সুড়ঙ্গ দিয়ে যুক্ত। শুধু তাই নয়, সেখানে আছে অন্ধকার সব গলি আর গোলকধাঁধার মতো গুহা!
আসলে সেই সময় মিশনারিরা ভাবতেন, এই অন্ধকার সুড়ঙ্গগুলো খুব বিপজ্জনক। তাই তাঁরা সেই গুহার মুখগুলো বড়ো বড়ো পাথর আর মাটির সাহায্যে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, যাতে কেউ সেখানে ঢুকতে না পারে। ব্যস! এভাবেই প্রায় ৩৫০ বছর ধরে সবার চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল এই পাতালপুরী।
এই সময় প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেই পুরানো ডায়েরির কথা মেলাতে গিয়েই আধুনিক মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করলেন। আর ঠিক যেখানে ফাদার বুরগোয়া লিখেছিলেন, সেখানেই পাওয়া গেল সেই হারানো কক্ষগুলো! প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন অত্যাধুনিক ‘গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার’ দিয়ে মাটির নীচে স্ক্যান করলেন, তখন কম্পিউটারের পর্দায় দেখা গেল এক বিশাল গোলকধাঁধা বা ল্যাবিরিন্থ। তাঁরা আরও দেখলেন ঘরগুলোর দেওয়ালের রং একদম টকটকে লাল। ‘সিনাবার’ নামের এক খনিজ পাথর থেকে এই রং তৈরি হয়েছিল। জ্যাপোটেকরা বিশ্বাস করত লাল হল জীবনের রং। প্রায় ১৪০০ বছর ধরে এই রং নষ্ট না হওয়ার ঘটনা বিরাট বিস্ময়ের।
প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের জন্য এখন আর শুধুই কোদাল দিয়ে মাটি খোঁড়া হয় না। এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে থ্রিডি ইমেজিং প্রযুক্তি। এটা অনেকটা মাটির ‘এক্স-রে’ করার মতো। ওপর থেকে মেশিন চালালেই কম্পিউটারের পর্দায় ফুটে উঠছে মাটির নীচে থাকা সেই হাজার বছরের পুরানো অলিগলি। আর এভাবেই সবার চোখের আড়ালে থাকা ‘বিশ্রামের স্থান’ বা লিওবা আবার পৃথিবীর সামনে ধরা দিয়েছে।
এই মিশনের পেছনে কিন্তু কোনো একজন সুপারহিরো নেই, আছে ১৫ জন গবেষকের এক জবরদস্ত টিম। সেখানে যেমন মাটি খোঁড়া প্রত্নতাত্ত্বিক আছেন, তেমনি আছেন তুখোড় ইঞ্জিনিয়ারও। তাঁরা জানিয়েছেন এটা ছিল ‘প্রজেক্ট লিওবা’-র প্রথম অভিযান। আগামী কয়েক বছরে তাঁরা আরও অনেক লুকানো ঘর আর গোপন সুড়ঙ্গ খুঁজে বের করবেন।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা মাটির নীচে ‘স্তম্ভের প্রাসাদ’-এরও হদিশ পেয়েছেন। এটা ছিল সেই আমলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মাটির নীচে এই পুরানো ঘরগুলোর খোঁজ পেয়ে এখন জ্যাপোটেক ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া টুকরোগুলোকে পাজল গেমের মতো জোড়া লাগানো সম্ভব হচ্ছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা কেন এত কষ্ট করছেন? শুধু কি পুরানো পাথর দেখার জন্য? একদমই নয়! তাঁরা দেখছেন, এই হাজার বছরের প্রাচীন দালানগুলো ভূমিকম্পে কতটা নিরাপদ। তাঁরা চাইছেন এমন ব্যবস্থা করতে যাতে আগামী হাজার বছর পরেও তোমাদের মতো ছোটোরা এসে এই জ্যাপোটেক জাদু দেখতে পারে। কারণ এই পাথরগুলোই হল আমাদের শিকড়— যা আমাদের অতীতের সঙ্গে জুড়ে রাখে।
তোমরা তো মিশরের পিরামিডের কথা জানোই। কিন্তু মেক্সিকোর এই জ্যাপোটেক সমাধিগুলো কি তার চেয়ে কম?
মিশরের পিরামিডগুলো চূড়ার দিকে ছুঁচলো, কিন্তু জ্যাপোটেকদের পিরামিডগুলো ছিল সিঁড়ির মতো ধাপকাটা। কেন জানো? কারণ আগেকার দিনে ভাবা হত মিশরের রাজারা সমাধি মন্দিরের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকতেন, আর মেক্সিকোর রাজারা ওপরে উঠে আকাশের তারাদের সঙ্গে গল্প করতেন।
মিশরীয় পিরামিড ছিল রাজাদের বিশাল কবর। কিন্তু জ্যাপোটেক সমাধিগুলো ছিল অনেকটা মাটির নীচের রাজপ্রাসাদের মতো। সেখানে শুধু মৃত রাজাই থাকতেন না, তাঁর পরিবারের লোকজনও নিয়মিত আসতেন প্রার্থনা করতে।
মিশরীয়রা শরীরকে ব্যান্ডেজ দিয়ে মুড়িয়ে রাখত। আর জ্যাপোটেকরা বিশ্বাস করত মৃতদেহকে গয়না দিয়ে সাজিয়ে রাখায়।
মিটলার এই সমাধিগুলোর ওপরে বিশাল বিশাল পাথরের স্তম্ভ বা পিলার আছে। এক-একটি পিলার একটি মাত্র আস্ত পাথর কেটে তৈরি। তখনকার দিনে তো আর আমাদের মতো জেসিবি বা ক্রেন ছিল না। তাহলে তারা অত ওজনের পাথর পাহাড় থেকে বয়ে এনে খাড়া করল কী করে? এটা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য। হয়তো জ্যাপোটেকরা পিঁপড়েদের মতো দল বেঁধে বিশাল সব পাথর টেনে আনত, অথবা তাদের কাছে ছিল এমন কোনো প্রাচীন প্রযুক্তি যা আমরা আজও জানি না। সিমেন্ট ছাড়াই শুধু পাথর দিয়ে যে এমন অমর কীর্তি গড়া যায়, তা জ্যাপোটেকরা প্রমাণ করেছে।
তোমরা কি জানো, জ্যাপোটেকদের এই রহস্যময় মন্দিরটি কিন্তু প্রচণ্ড লড়াইয়ের মধ্যেও টিকে ছিল? প্রায় ৫০০ বছর আগে যখন জ্যাপোটেকদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় অ্যাজটেক আর তারপর স্প্যানিশদের হাতে, তখন থেকেই এই পাতালপুরী ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে।
আজ যারা তোমরা স্কুলে ইতিহাস ও বিজ্ঞান পড়ছ, তাদের মধ্যেই কেউ হয়তো ভবিষ্যতে এমন কোনো সেন্সর বানাবে, যা দিয়ে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে লুকিয়ে থাকা হারিয়ে যাওয়া লুকানো শহর খুঁজে পাওয়া যাবে।
পৃথিবীটা আসলে একটা বিশাল গল্পের বই। আমরা কেবল উপরের পাতাগুলো পড়ছি, রোমাঞ্চকর অনেক নতুন ট্যুইস্ট কিন্তু মাটির নীচেও লুকিয়ে আছে। তাই পরের বার যখন বাগানের মাটি খুঁড়বে বা কোনো পুরানো বাড়ি দেখবে, একটু ভালো করে নজর রেখো। কে জানে, হয়তো তোমার পায়ের নীচেই কোনো ‘৫-খরগোশ’ নামের রাজা একটা পাথরের পাজল নিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন!