Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মেট্রো রেলই মহানগরের ভবিষ্যৎ

মাটির বুকে সভ্যতার অবতরণ চাকায় ভর দিয়ে। সভ্যতায় গতিসঞ্চারেও যার এক ও অনন্য ভূমিকা সেও ওই চাকা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাকার বিস্তার ঘটেছে নানা ক্ষেত্রে।

মেট্রো রেলই মহানগরের ভবিষ্যৎ
  • ২৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মাটির বুকে সভ্যতার অবতরণ চাকায় ভর দিয়ে। সভ্যতায় গতিসঞ্চারেও যার এক ও অনন্য ভূমিকা সেও ওই চাকা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাকার বিস্তার ঘটেছে নানা ক্ষেত্রে। তার মধ্যে যানবাহনে চাকার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। স্থলপথে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহণে বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। এই বিচিত্রতাই স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে নাগরিক জীবনে। আধুনিক বিশ্বের লক্ষ্য নগরায়ণ এবং তার দ্রুত সম্প্রসারণ। গ্রাম-মফস্সলের তুলনায় নগরগুলিতে দূষণের সমস্যা বেশি। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, কলকাতার মতো ভারতের মহানগরগুলি তো এই সমস্যায় জর্জরিত। দূষণমুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থাকে সুন্দর করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল বৃদ্ধিপ্রাপ্ত গতি। ট্রাম, ইলেক্ট্রিক বাস প্রভৃতি গণপরিবহণ দূষণমুক্ত হলেও কলকাতার মতো শহরের দাবি পূরণে অক্ষম। তার মূল কারণ পুরনো এই মহানগরে রাস্তার আকার আয়তন প্রয়োজনের তুলনায় সংকীর্ণ। ফলে এই দুই ধরনের গাড়ি বহুলাংশে যানজটের কারণ হয়ে ওঠে। তার উপর এখানে ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার, সাধারণ বাস, মিনিবাস-সহ বহু ধরনের গাড়ি চলাচল করে। সবটা মিলিয়েই এই শহরের যানবাহনের মানচিত্র উজ্জ্বল। 

Advertisement

ব্যাপারটা ছবিতে দেখতে যতটা সুন্দর, যাপনের অঙ্গ হিসেবে ততটা মনোরম নয়। এই সমস্যার সুরাহায় ব্রিটিশ ভারতই কলকাতাকে মেট্রো রেল গ্রহণে প্রস্তুত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গের কর্মযোগী মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ও কলকাতাকে মেট্রো রেল উপহার দিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের সূচনা হয় চার দশক আগে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বঙ্গসন্তান রেলমন্ত্রী এ বি এ গনিখান চৌধুরীর হাতে। ভারতকে মেট্রো রেলের পথ দেখিয়েছে আমাদের কলকাতা। তারপর একে একে রাজধানী দিল্লিসহ দেশের অনেকগুলি বড় শহর মেট্রো রেল পেয়েছে। অন্যদিকে, দেরিতে হলেও কলকাতারও নানা দিকে শাখা বিস্তার করেছে মেট্রো রেল। ১৬ বছর আগে গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছিল তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দক্ষতায়। ২০০৯ সালের ২২ আগস্ট টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া বাজার পর্যন্ত মেট্রোর সম্প্রসারিত রুটের উদ্বোধন হয়। নতুন স্বপ্নের বুনন শুরু বস্তুত সেদিন থেকেই। ১৬ বছর পর, ২০২৫-এর সেই ২২ আগস্টেই আরও তিনটি মেট্রো রেল শাখার সম্প্রসারিত অংশের প্রাপ্তিযোগ হল আমাদের। ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো রুট সম্পূর্ণ হল। একই দিনে কবি সুভাষ থেকে বেলেঘাটা এবং নোয়াপাড়া থেকে বিমানবন্দর (জয়হিন্দ) রুটেরও উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উল্লেখ্য,  দেশের প্রধানমন্ত্রী সেদিন যশোর রোড থেকে জয়হিন্দ মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত সফরকালে স্কুলপড়ুয়াদের সঙ্গে খোশগল্পে মজে গিয়েছিলেন। বস্তুত হাওড়া ও শিয়ালদহ রেল স্টেশন এবং কলকাতা বিমানবন্দর মেট্রো রেলের এক সুতোয় গেঁথে যাওয়ার এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যাপারটি কলকাতা এবং শহরতলি এলাকায় গণপরিবহণ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। 
আমরা সকলেই চাই, এই মাহেন্দ্রক্ষণের আনন্দ যেন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তার জন্য প্রতিটি মেট্রো রুটকে সবরকমে গতিশীল এবং নিরাপদ রাখতে হবে। ইস্ট-ওয়েস্ট রুটে যাত্রী উপচে পড়ার কথা। কিন্তু শহরের বাকি মেট্রো রুটগুলি এখনও অসম্পূর্ণ এবং নির্মীয়মাণ। যাত্রীস্বার্থে সেগুলির কাজ দ্রুত সম্পূর্ণ করে ফেলা দরকার। একইসঙ্গে বাড়াতে হবে রেক এবং চালকের সংখ্যা। বাড়াতে হবে স্ক্যানিং-সহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। টিকিট কাউন্টারগুলিতেও পর্যাপ্ত সংখ্যায় কর্মী দিতে হবে। টাইম টেবিলে রাতের গুরুত্ব অত্যন্ত কম। বিশেষ করে অসম্পূর্ণ রুটগুলিতে। অন্তত রাত ১১টা পর্যন্ত গাড়ি না পেলে গণপরিবহণে বাস এবং ক্যাবের উপর নির্ভরতা থেকেই যাবে। বিশেষ করে ট্যাক্সি/ক্যাব নির্ভরতা কমাতে না পারলে যাত্রীদের সময় সাশ্রয় এবং আর্থিক সুরাহার স্বপ্ন রয়ে যাবে অধরাই। দক্ষিণেশ্বর-গড়িয়া মেট্রো রুটের সমস্যারও আশু সমাধান জরুরি। তবেই সার্থক মেট্রো সার্ভিস পাবে কলকাতার মানুষ। কলকাতাকে সত্যিই বাসযোগ্য এবং মহানগরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে তুলতে হলে মেট্রো রেলের সার্বিক শ্রীবৃদ্ধির বিকল্প নেই। বস্তুত মেট্রো রেলই মহানগরের ভবিষ্যৎ। আমরা আশা রাখব, ভারতীয় রেল আমাদের সহায় হবে। সহযোগিতার নীতিতে পাশে থাকবে রাজ্য সরকারও। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ