যে স্মৃতি ও সংস্কার আমাকে বহু জন্ম-জন্মান্তর পরিগ্রহ করাইয়া পিতামাতার আদর যত্ন ও স্নেহ-বন্ধনে আবদ্ধ করিয়া ঘোর বিভ্রম-বিস্মৃতির অতল তলে ডুবাইয়া দিয়াছে,—আজ এই শুভ সময়ে সেই স্মৃতি ও সংস্কারকে নষ্ট করিয়া ব্রহ্মচর্য্যব্রত ধারণ পূর্ব্বক—এই নবজীবন গ্রহণ করিলাম।আমার এখন আর জাতি-গোত্র, আত্মীয়-পর কিছুই নাই। আমার আছেন শুধু একজন—যিনি কখন সরূপ কখন অরূপ, কখন আদি কখন অনাদি, কখনও সবিকল্প কখনও বা নির্বিকল্প। আমি চন্দ্র-সূর্য্য-গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতি দিক্পালকে সাক্ষী করিয়া শপথ করিতেছি—এ জীবনে এই ব্রত ও বেশ পরিত্যাগ করিব না। এই মহাব্রত গ্রহণের নিমেষ পূর্ব্বে যে-আমি ছিলাম এখন আর সে-আমি নাই। আজ আমি নব বলে বলীয়ান। যাবতীয় বিষয়-বাসনা পরিত্যাগ পূর্ব্বক, অনির্ব্বাণ ইন্দ্রিয়-সুখ-সম্ভোগ-স্পৃহাকে নষ্ট করিয়া নব ভাবে নূতন আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া মহামুক্তির পথে গমনোদ্যোগী।
আমার বিষয়-সুখসম্ভোগকারী দেহকে শাসন করিয়া আমি ভোগবিলাস-বিহীন চিত্তবৃত্তি লইয়া বসবাস করিব। এতকাল পর্যন্ত অজ্ঞানতাপ্রযুক্ত যে-মোহে আমি নিমজ্জিত ছিলাম—সেই মোহ, সেই স্মৃতি, সেই জঘন্য ভাব আমার ধ্বংস হউক। যে বুদ্ধি আমাকে নানা বাসনাজালে বিজরিত করিত, সেই বুদ্ধি আজ নষ্ট হউক। যে জ্ঞান পিতামাতা আত্মীয়-স্বজনের স্নেহবন্ধনে, মায়িক কর্তব্য-পালনে আমাকে আবদ্ধ করিয়া রাখিত,—সেই জ্ঞান ও বোধ আমার বিনষ্ট হউক। আজ আর আমার ভিতরে কোন পাপতাপ নাই, কোন মায়া-মোহ নাই, কোন ভ্রম-ভ্রান্তি নাই; এখন আমি—নিৰ্ম্মল, নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক। আমার দুর্ব্বল মন সবল হইয়া আমাকে মহামুক্তির পথে গমনে শক্তি প্রদান করিতেছে। আমার হৃদয় আজ বিবেক-বৈরাগ্যের আলোকে আলোকিত হওয়ায় আমি আজ মহামুক্তির পথে প্রবর্ত্তিত হইলাম।
যে বিষম বিভ্রম ও বিস্মৃতি এতকাল পর্যান্ত অসত্যে সত্য বোধ আনিয়া, অবস্তুতে বস্তু বোধ দিয়া, অনিত্যে নিত্য বোধ জাগাইয়া—আমার অনন্ত শক্তি-সামর্থ্য ও বিপুল বিক্রম-পরাক্রমকে দমন করিয়া পাপ-তাপ ও মায়া-মোহের পথে প্রবর্ত্তিত করিত;—এই মহাব্রত দ্বারা হৃদয়ে আত্মস্মৃতি জাগাইয়া, চির জনমের মত এই বিভ্রম-বিস্মৃতিকে বিনষ্ট করিয়া সেই পরম পুরাণ পুরুষের সহিত আপনাকে মিলাইয়া মিশাইয়া দিবার জন্য এই মহামুক্তি ও শাশ্বতঃ কল্যাণের পথে প্রবর্তিত হইলাম।
স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের যুগবাণী ‘শ্রীশ্রীসঙ্ঘ-গীতা’ থেকে