Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মোদির ভারতে বাড়ছে দুর্নীতি!

মোদির ভারতে বাড়ছে দুর্নীতি!
  • ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
বিষয়: দুর্নীতি। এটি নরেন্দ্র মোদির খুবই পছন্দের সাবজেক্ট বলে দাবি করে বিজেপি। এর কারণ অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নিজেই। নিজেকে স্ফটিকের মতো ‘স্বচ্ছ’ বোঝাতে ২০১৪ সালে প্রথমবার ‘দুর্নীতি মুক্ত’ ভারত গঠনের স্বপ্ন ফেরি করেছিলেন। সেবার ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হয়ে একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের মতো দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে ঘোষণা করেন, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’। যার মর্মার্থ হল, সরকারি অর্থ-নয়ছয় করব না, করতেও দেব না। সেই সময়ে তাঁর দলের ঘোষণা ছিল, ‘সুশাসন সঙ্কল্প, বিজেপি বিকল্প।’ দ্বিতীয় মনমোহন সিং নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতি বোঝাতে তখন নিত্যদিন টুজি টেলিকম, কয়লাখনি বণ্টন, কমনওয়েলথ গেমস নিয়ে ক্যাগের গুরুতর অভিযোগকে ভোটের প্রচারে হাতিয়ার করেছেন নরেন্দ্র মোদি। সেইসঙ্গে ওই অঙ্গীকার। তারপর গত দশ বছরে তাঁর দু’দফার শাসনকালে সংসদে ও সংসদের বাইরে মোদির এমন কোনও ভাষণ শোনা যায়নি যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি জেহাদ ঘোষণা করেননি। এমনকী লোকসভা ও বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার ভোটে জিততে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিরোধী নেতাদের জেলে ভরার ঘটনাকে তিনি প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। অন্যদিকে আবার দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলা বিভিন্ন দলের অন্তত ২৫ জন নেতা বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নিতে দেখা গিয়েছে শাসককে। জাতীয় রাজনীতিতে যা বিজেপি’র ‘ওয়াশিং মেশিন’ রাজনীতি বলে পরিচিত। দুর্নীতি নিয়ে যাঁর এমন ‘জিরো টলারেন্স’ মনোভাব, তাঁর আমলেই কি না দেশ দুর্নীতির চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে! কোনও বিরোধী দল নয়, এই মূল্যায়ন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের। যারা দেখিয়েছে, কীভাবে মোদির ভারত দুর্নীতির পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে।
Advertisement
মোদির এই পছন্দের বিষয়ে পাশের নম্বর ছিল ১০০তে ৪৩। ২০২৪-এ ভারত পেয়েছে ৩৮ নম্বর। তার আগের দু’বছর অর্থাৎ ২০২২ ও ২৩-এ ভারতের প্রাপ্ত নম্বর ছিল যথাক্রমে ৪০ ও ৩৯। অঙ্কের হিসেবে পরিষ্কার, দুর্নীতিরোধের প্রসঙ্গ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যত গলা চড়িয়েছেন, ভারতের নম্বর তত কমেছে। জার্মানির একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতি বছর এ নিয়ে সমীক্ষা করে। সরকারি স্তরে দুর্নীতিকে এই সূচকের মান নির্ধারণের জন্য বিবেচনা করা হয়। দেখা যাচ্ছে, মোদি যবে থেকে প্রধানমন্ত্রী, তবে থেকে আজ পর্যন্ত কোনও বছরই ন্যূনতম পাশ নম্বরও তুলতে পারেনি ১৪২ কোটির দেশ ভারত। এর অর্থ একটাই, মোদির ভারতে সরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমেনি, বরং তা বেড়েছে। বিশ্বের মোট ১৮০টি দেশ ‘বিষয়: দুর্নীতি’-র পরীক্ষায় বসেছিল। পরীক্ষাতে ১০০ তে ১০০ পেয়ে প্রথম হয়েছে (সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয়েছে বা হয়নি) ডেনমার্ক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর। ট্রাম্পের আমেরিকা রয়েছে ২৮তম স্থানে। এশিয়ার অন্যতম বৃহত্ শক্তি চীন ৭৬-এ। ভারতের তিন প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ রয়েছে যথাক্রমে ১৩৫, ১২১ এবং ১৪৯তম স্থানে। আর ভারত! ২০২৩-এ এ দেশ ছিল ৯৩-তে। এবার আরও তিন ধাপ নেমে পৌঁছেছে ৯৬-তে। দুর্নীতির মানদণ্ডে ভারত রয়েছে মাঝামাঝি স্থানে। এই সমীক্ষা রিপোর্ট দেখে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর গেরুয়াবাহিনী সান্ত্বনা পেতে পারেন। কারণ ভারতের প্রতিবেশী তিন দেশ ভারতের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সাল থেকে ধরলে বিশ্বের ৩২টি দেশ দুর্নীতি কমাতে পেরেছে। কিন্তু ১৪৮টি দেশ হয় একই জায়গায় রয়েছে অথবা তাদের দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন, কারণ এই সমীক্ষা অনুযায়ী দুই তৃতীয়াংশের বেশি দেশ ৫০ নম্বরও পায়নি। এই তথ্য পরিসংখ্যান হাতে আসার পরও দুর্নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আগের মতোই লম্বা-চওড়া ভাষণ দেবেন কি না, বা সেটা শোভন দেখাবে কি না তা বোধহয় ভেবে দেখার সময় এসেছে।
আরও অনেক আন্তর্জাতিক রিপোর্টের মতো এই সমীক্ষাকেও অস্বীকার করতে পারে মোদি সরকার। কিন্তু এই আমলে শিক্ষায় ব্যাপম কেলেঙ্কারি, রাফাল যুদ্ধবিমান কেনা, পেগাসাস কেলেঙ্কারির কথা ভোলা যাবে না। কোনও কিছুর বিনিময়ে কাউকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া’-র নীতিতে নির্বাচনী বণ্ডের মাধ্যমে যে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তাও মোদির ‘স্বচ্ছতার’ প্রচারকে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। অথবা ক্যাগ রিপোর্ট অনুযায়ী অন্তত ৮টি সরকারি প্রকল্প নিয়ে নয়ছয়ের যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তা কি অস্বীকার করা যাবে? এর মধ্যে সড়ক পরিবহণ, হ্যালের বিমান নির্মাণের নকশা, আযুষ্মান ভারতের মতো প্রকল্প রয়েছে। বিজেপি’র শীর্ষস্তরের দুই নেতার বিরুদ্ধে যে জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগ তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। আসলে মোদি জমানায় দুর্নীতির অভিযোগ মূলত বিরোধীরা তোলায় তা বারবারই ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের দুর্নীতির তকমাকে কী করে মুছে দেবেন মোদি-অমিত শাহরা?
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ