জয়ন্ত সেন: ফ্রান্স-৩ : সুইডেন-০
জয়ন্ত সেন: ফ্রান্স-৩ : সুইডেন-০
‘ঘরের দরজা খোলা থাকলে, চোর তো চুরি করবেই’— রাউন্ড অব ৩২’তে ফ্রান্স-সুইডেন ম্যাচ দেখার পর এটাই মনে হচ্ছিল। কিলিয়ান এমবাপে, ওসুমানে ডেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, বারকোলা সমৃদ্ধ ফরাসি আক্রমণ। তাদের বিপক্ষে সুইডেন তিন ডিফেন্ডারে দল সাজিয়েছে। এ তো আত্মঘাতী! তাই যা হওয়ার সেটাই হয়েছে। সুইডিশদের ৩ গোলের মালা পরিয়ে শেষ ষোলোয় দিদিয়ের দেশঁর ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপের একারই জোড়া গোল। চলতি আসরে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে লায়োনেল মেসিকে ছুয়ে ফেলল ও। দু’জনেরই ৬টি করে গোল। আর অপর গোলদাতা বারকোলা।
ফ্রান্সের খেলার বিশ্লেষণের আগে আমি দিদিয়ের দেশঁকে কৃতিত্ব দিতে চাই। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট।’ এই ফরাসি দলে তারকার ছড়াছড়ি। কিন্তু তা সত্ত্বেও টিমটা যেন এক সুতোয় বাঁধা। কোচের সদ্য মাতৃবিয়োগ ঘটেছে। তাই প্রথম গোলের পর এমবাপে দৌড়ে গিয়ে দেশঁকে তা উৎসর্গ করল। যেন এক নিটোল পারিবারিক বন্ধন। আর স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করে বলা যায়— পদ্ধতি নিয়ে অনেকে কথা হয়, তবে খেলোয়াড়ের গুণমানই পদ্ধতিকে সার্থক করে তোলে। ফরাসি ডাগ-আউটে দেশঁ ঠিক এই কাজটিই করছেন। আক্রমণভাগে এমবাপে, বারকোলা, ডেম্বেলে ও ওলিসেকে তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন। তারই সুফল মিলছে। আর এই চারজন অনবরত নিজেদের পজিশন পরিবর্তন করে বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের খাবি খাওয়াচ্ছে। কাকে ছেড়ে কাকে আটাকাবে? ডেম্বেলেকে আটকালে বারকোলা, বারকোলাকে রুখলে ওলিসে, এমবাপে। ৪৫ মিনিটে প্রথম গোলের কথাই ধরুন, ডেম্বেলের থেকে বল পেয়ে বিপক্ষ বক্সে দু’জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে অসাধারণ গোল এমবাপের (১-০)। প্রতিপক্ষের ফুটবলাররাও হাঁ করে দেখছিল। বিরতির পরও একই চিত্র। এবার অবশ্য দু’টি গোলে বড় অবদান রাখে মাইকেল ওলিসে। অসাধারণ প্লেয়ার। ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে উইঙ্গার হিসেবে খেলে। তবে বিশ্বকাপে তাকে ফিডারের ভূমিকা দিয়েছে কোচ। গত বিশ্বকাপে গ্রিজম্যান যে কাজটা করছিল আর কী! ওলিসে কিন্তু গ্রিজম্যানের অভাব টের পেতে দিচ্ছে না। ৫৩ মিনিটে তার ডিফেন্স চেরা পাস থেকেই ব্যবধান দ্বিগুণ করল বারকোলা। আর ৭৪ মিনিটে তৃতীয় গোলে তার পাসকে ম্যাজিক বললেও কম হবে। এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সের মধ্যে কাঁটা কম্পাস দিয়ে মাপা পাস এমবাপেকে। তাতে লক্ষ্যভেদে ভুল হয়নি রিয়াল মাদ্রিদ তারকার। চলতি বিশ্বকাপে এটা পঞ্চম অ্যাসিস্ট ছিল ওলিসের। আলাদা করে উল্লেখ করতে হবে এমবাপের সঙ্গে তাঁর জুটির কথা। মাঝমাঠ থেকে অ্যাটাকিং থার্ডে এই দু’জনের বিচরণ মানেই কম্পমান সুইডিশ রক্ষণ। কী নেই তাতে! গতি, ড্রিবল,আচমকা শট। তবে ওলিসে নিঃস্বার্থ ভাবে গোলের বল সাজিয়ে দিচ্ছে সতীর্থদের। চলতি বিশ্বকাপে এমবাপের ৬টি গোলের মধ্যে ৩টিই অ্যাসিস্ট করেছে ওলিসে। কিলিয়ান কিন্তু ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে এতো ভালো সাপোর্ট পায় না। তাই স্প্যানিশ জায়ান্টে তাকে কিছুটা ফিকে দেখায়। তবে দেশের জার্সিতে সে যেন বাঘ। বিশ্বকাপে মোট গোলের নিরিখেও ক্লোজেকে টপকে মেসির (১৯) ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে এমবাপে (১৮)।
সবমিলিয়ে সুইডেনকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে ফ্রান্স। ফরাসি ব্রিগেডকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা বিশ্বকাপ জেতার জন্যই নেমেছে। অবশ্য এটাও ঠিক, এখনও পর্যন্ত কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েনি ফ্রান্সের ডিফেন্স।