রাত পোহালেই শপথ নেবে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে দেড় দশকের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। শনিবার, ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নেবে বিপুল ভোটে বিজয়ী দল বিজেপির সরকার। উপস্থিত থাকবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আর থাকবেন একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিজেপি/এনডিএ পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলির মুখ্যমন্ত্রীরা। নতুন রাজ্য সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান সাধারণভাবে লোকভবনেই (রাজভবন) হয়ে থাকে। এবারই তার ব্যতিক্রম হতে চলেছে। ওইসঙ্গে শপথ নেবার দিনটিও তাৎপর্যপূর্ণ—বাংলা ও বাঙালির প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। যে মনস্বী-কবি জাতিকে ক্ষুদ্রত্বের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে এসে ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে’র আদর্শে এগিয়ে যেতে শিক্ষা দিয়েছেন। যিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। অমৃত-রস উথলে উঠে দিন-রাত অনন্ত গগনের দিকে বয়ে চলেছে...। আর এখানেই কবির প্রশ্ন, এই যখন আবহ তখন কেন কেবল ক্ষুদ্রস্বার্থ চরিতার্থ করার মোহে বসে আছি আমরা? কবি বলছেন, নিজেকে গুটিয়ে না রেখে আপনাপন হৃদয়কে প্রসারিত করো, তবেই দুঃখকে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ মনে হবে, যে জীবন শূন্য মনে হচ্ছে সেটা প্রেমে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। আজ প্রবাহিত বাতাসকে ‘শান্তি পবন’ আখ্যা দিচ্ছেন কবি, কেননা তাতে মিশে রয়েছে ‘অমৃত পুষ্পগন্ধ’। কবি চান আমরা সকলে নব রবি-কিরণে নব আনন্দে জেগে উঠি। আমাদের নির্মল জীবন হয়ে উঠবে শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল।
এই ভাবনা যখন আমাদের প্রাণিত করছে, বিচ্ছিন্ন হলেও, তখন দিকে দিকে কিছু অশান্তির খবর বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, এমন আনন্দমুহূর্তকে বরণ করে নিতে আমরা প্রস্তুত হতে পারিনি। নির্বাচনি হিংসা বাংলার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছে কয়েকদশক যাবৎ। প্রচার থেকে ভোটগ্রহণ—এই দীর্ঘ পর্বে রক্তক্ষয় এবং একের পর এক প্রাণহানির বাস্তব যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্য এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। বাংলা ও বাঙালিরও আকাঙ্ক্ষা ছিল শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) এবারের দৃঢ় পদক্ষেপে, বহু বছর বাদে, সেই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। কোনো পক্ষের প্রাণহানি ছাড়াই প্রচার এবং ভোটগ্রহণ পর্ব উত্তীর্ণ হওয়া গিয়েছে। সব মিলিয়ে সারা দেশের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছে ইসিআই। কিন্তু এক বালতি দুধে গোচোনা ফেলার মতোই অবাঞ্ছিত হিংসাত্মক কাণ্ড ঘটে চলেছে নির্বাচনোত্তর পর্বে। ভাঙচুর, মারামারি চলছেই। গন্ডগোল থামাতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছে পুলিশ। এমনকি ঘটে গিয়েছে একাধিক ব্যক্তির প্রাণহানিও। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার রাতে উত্তর শহরতলির মধ্যমগ্রামে। সেখানে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে রাজপথে প্রাণ দিয়েছেন চন্দ্রনাথ রথ, একসঙ্গে দুটি কেন্দ্র থেকে জয়ী বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক তিনি!
যেহেতু প্রশাসনের রাশ আর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে নেই এবং দায়িত্ব নেয়নি নতুন সরকারও, তাই এই ঘটনাগুলির সম্পূর্ণ দায় নির্বাচন কমিশনের উপরেই বর্তায়। প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে তাদের ‘জিরো টলারেন্স নীতি’। তবে এখনো পর্যন্ত খবর হল, নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে যৌথ কন্ট্রোল রুম চালু করেছে রাজ্য এবং কলকাতা পুলিশ। অন্যদিকে, নতুন শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকেও সকলের উদ্দেশে শান্তির বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাদের সাফ কথা, এরপরেও কেউ বেপরোয়া আচরণ করলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সামনে অন্তরায় হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন। সোজা কথায়, পুলিশকে ‘ফ্রি হ্যান্ড’ দেওয়ার কথাই ঘোষণা করা হয়েছে। ‘দলদাসের সংস্কৃতি’ থেকে পুলিশকে বের করে আনাই হবে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ, মুক্তকণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। একটা কথা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, আমরা শুভ সূচনা করে থাকি অনেক, কিন্তু শেষরক্ষা করি ক্বচিৎ। রাজ্যবাসী এই আশায় থাকবেন যে, ‘প্রকৃত পরিবর্তনের ডবল ইঞ্জিন সরকার’ অন্তত কথা রাখবে। বাংলায় ফিরবে সরকারি ক্ষেত্রে কথা রাখার কালচার। এই পর্যন্ত ঘটে যাওয়া প্রতিটি অন্যায় এবং অপরাধের বিচারে আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতা দেখাবে বাংলার প্রথম বিজেপি সরকার। তবেই ‘জুমলা’ কটাক্ষ থেকে মুক্ত হতে পারবে ‘মোদির গ্যারান্টি’।