Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মতুয়া: সাপের ছুঁচো গেলা অবস্থা বিজেপির

সাপের ছুঁচো গেলা কাকে বলে, সেটা শান্তনু ঠাকুর হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে এতদিন গলা ফাটিয়েছেন।

মতুয়া: সাপের ছুঁচো গেলা অবস্থা বিজেপির
  • ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: সাপের ছুঁচো গেলা কাকে বলে, সেটা শান্তনু ঠাকুর হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে এতদিন গলা ফাটিয়েছেন। ক্যাম্প করে আবেদনপত্র জমা নিয়েছেন। যথাস্থানে ‘প্রণামী’ দিলে বেআইনি বিল্ডিংও বৈধ হয়। কাঁটাতার টপকে বাংলাদেশ থেকে আসা লোকজনও হয়তো ভেবেছিলেন, ‘প্রণামী’ দিলেই মিলবে ভারতের নাগরিকত্ব। তারজন্য হাজার হাজার মতুয়া প্রণামী দিয়েছেন। নাগরিকত্ব পাবেন, ভোটার তালিকায় নাম উঠবে, সেই আশাতেই ছিলেন তাঁরা। কিন্তু এক লক্ষ মতুয়ার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলেও আমাদের সহ্য করতে হবে, শান্তনু ঠাকুরের এহেন মন্তব্যে বেজায় চটেছেন ‘ভক্ত’রা। তাঁরা বুঝতে পারছেন, নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়ির ঠাকুরমশাই এতদিন যা বলেছেন, সবটাই ধাপ্পা। 

Advertisement

২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর সংসদে পাশ হয় সিএএ। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন হতেই আনন্দে আত্মহারা মতুয়ারা রাস্তায় নেমে খোল-করতাল, ডঙ্কা বাজিয়ে উল্লাসে মেতেছিলেন। মনে করেছিলেন, নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেবে মোদি সরকার। তারপর পাঁচ-পাঁচটা বছর কেটে গেলেও বাংলাদেশ থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষগুলো নাগরিকত্ব পাননি। সেই তালিকায় যেমন মতুয়ারা আছেন, তেমনই আছেন নমঃশূদ্ররা। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। এসআইআর-এ বাদ গিয়েছে ৫৮ লক্ষ নাম। আরও লক্ষ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য সুতোয় ঝুলছে। যাঁরা ডাক পাচ্ছেন তাঁদের সিংহভাগই হয়তো পরীক্ষায় উতরে যাবেন। কিন্তু, শুনানিতে যাওয়ার হয়রানির ক্ষোভ গিয়ে পড়বে বিজেপির উপরেই। কারণ এক কোটি নাম বাদ দেওয়ার হুঙ্কার বিজেপি নেতারাই দিয়েছেন। 
এসআইআর পর্বের স্লগ ওভারের মধ্যে বঙ্গ সফরে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সভা করার জন্য মতুয়াগড় রানাঘাটকে বাছা হয়েছিল। বঙ্গ বিজেপি বুঝতে পারছে, এসআইআর করে তাদের লাভের লাভ কিছুই হয়নি। উল্টে ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের তালিকায় ঢুকে গিয়েছে বহু হিন্দুর নাম। তারমধ্যে বাংলাদেশ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ নমঃশূদ্র যেমন আছেন, তেমনই আছেন মতুয়ারা। তাঁদের নাম বাদ গেলে দক্ষিণবঙ্গে বিজেপিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেটা গেরুয়া নেতারা জানেন। কারণ একুশের ও চব্বিশের নির্বাচনে তাদের মুখরক্ষা করেছিলেন মতুয়ারাই। তাঁরা বিরূপ হলে বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া কঠিন হবে।
সেই আশঙ্কা ফুটে উঠেছে গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরের কথায়। তাঁর দাবি, কেবল বনগাঁ মহকুমাতেই ১ লক্ষ ২০ হাজার মতুয়ার নাম বাদ যেতে বসেছে। নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য কমিশন নির্ধারিত কোনও প্রমাণপত্রই তাঁদের নেই। নিয়ম মেনে ভোটার তালিকা তৈরি হলে লক্ষাধিক মতুয়ার নাম যে বাদ যাবে, সেটা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরও মেনে নিয়েছেন। তবে এই ‘আত্মত্যাগ’ মতুয়াদের করা উচিত বলে তিনি মনে করছেন। তাঁর যুক্তি, যে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে, সবই রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি মুসলিম। সেখানে এক লক্ষ মতুয়ার নাম বাদ গেলে তাঁদের তা সহ্য করতে হবে।
এমনিতেই ‘বেনাগরিক’ হওয়ার আশঙ্কায় ঘুম ছুটেছে মতুয়াদের। এই অবস্থায় নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি ‘সহ্য’ করার পরামর্শ মতুয়াদের কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের সমান। ঠাকুরমশাইয়ের সহ্যের পরামর্শই মতুয়াদের সবচেয়ে অসহ্যের কারণ। মতুয়ারা বলছেন, ‘এতদিন নাগরিকত্ব দেওয়ার গাজর ঝুলিয়ে ভোট নিয়েছেন। নিজে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন। দাদাকে বিধায়ক করেছেন। আর এখন বলছেন, সহ্য করতে হবে?’
এসআইআর হলে এক কোটি রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি মুসলমানের নাম বাদ যাবে। বিজেপি নেতাদের এই দাবিতে খুশি হয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে উৎখাত হয়ে এদেশে আসা হিন্দুরা। ভেবেছিলেন, সেটা হলেই ইটের জবাবটা পাটকেলে দেওয়া হবে। কিন্তু, ইট যে তাঁদেরই মাথায় এসে পড়বে, সেটা কল্পনাও করতে পারেননি। এসআইআর-এর ছবি কিছুটা স্পষ্ট হতেই মতুয়ারা বুঝতে পারছেন, নাকের বদলে নরুনটাও জুটবে না। তবুও কেন্দ্রীয় সরকার কিছু একটা করবে, সেই আশা অনেকের ছিল। কিন্তু, শান্তনু ঠাকুর এক লক্ষ মতুয়া নাম বাদ যাওয়ার কথা বলায় তাঁরা বুঝেছেন, উদ্বাস্তু থেকে তাঁরা ‘শরণার্থী’ হবেন। কিন্তু দেশের নাগরিক হতে পারবেন না। 
সেই ক্ষোভ থেকেই গোঁসাই, পাগল, দলপতিরা হাজির হয়েছিলেন ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়িতে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন তাঁদের এভাবে ঠকানো হল? জবাব চাইতে যাওয়ার পরিণতি খুব একটা সুখকর হয়নি। জুটেছে কিল, চড়, ঘুসি। মাটিতে ফেলে যেভাবে চার, পাঁচজন একসঙ্গে লাথি মেরেছে তা সভ্যসমাজে রাস্তার কুকুরকেও মারে না। ঠাকুরবাড়ি চত্বরে জটাধারী নান্টু গোঁসাইকে মারধরের সেই ছবি যত ভাইরাল হচ্ছে, মতুয়াদের ক্ষোভ ততই তীব্র হচ্ছে। 
পেশায় চিকিৎসক তথা গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের একুশের ভোটের নির্দল প্রার্থী সজল বিশ্বাস মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। তিনি ঠাকুরবাড়ি কেন্দ্রিক রাজনীতির ঘোর বিরোধী। সজলবাবু বলেন, নাগরিকত্ব ইস্যুতে মতুয়াদের ক্ষোভটা স্বাভাবিক। শান্তনু ঠাকুর বিক্ষোভকারীদের বোঝাতে পারতেন। তিনি বলতে পারতেন, নাম বাদ দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। তাঁর কিছু করার নেই। কিন্তু, তার বদলে যেটা করা হল, সেটা হরিচাঁদ ঠাকুরের উত্তরাধিকারীদের কাছে কাম্য নয়। গোঁসাই, দলপতিদের পেটানোর দায় তাঁকেই নিতে হবে। কারণ তিনি এই ঘটনার নিন্দা করেননি, উল্টে ‘গুন্ডামি’কে সমর্থন করেছেন। এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের। 
ঠাকুরবাড়ি চত্বরে গোঁসাই, দলপতিদের পেটানোর ফল সুদূরপ্রসারী হবে বলে মনে করছেন অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসংঘের সর্বভারতীয় সম্পাদক রঞ্জিত বাইন। তিনি বলেন, ‘যাহার গলে করঙ্গের মালা দোলে/ শতজন্মের ভাই বলে তাকে নেবে কোলে।’ এটাই হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা। সেই নীতি নিয়েই আমরা চলি। কিন্তু, ঠাকুরবাড়ির জমিতেই পদদলিত হল করঙ্গের মালা। এর ফল হামলায় মদতদাতাদের ভোগ করতেই হবে। 
ঠাকুরনগর এলাকার এক মতুয়ার কথায়, ‘আমরা হরিভক্ত মানুষ। রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝি না। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আমরা টাকা বা চাকরি চাইনি। চেয়েছি নাগরিকত্ব। আমরা ভেবেছিলাম, প্রধানমন্ত্রী রানাঘাটের সভা থেকে আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করবেন। সেই আশাতেই আমরা দল বেঁধে সভায় গিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী সভায় আসছেন না জানার পরেও ভাষণ শোনার জন্য বসেছিলাম। ভেবেছিলাম, আমাদের সঙ্কটকালে তিনিই হবেন ‘ত্রাতা’। উনি গুরুচাঁদ-হরিচাঁদ ঠাকুরের নাম নিলেন। ‘জয় নিতাই’ বললেন। কিন্তু আমাদের যন্ত্রণা দূর করলেন না। উল্টে বাড়িয়ে দিলেন।’
অনেকে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে টুঁ শব্দ না করায় মতুয়া ও নমঃশূদ্ররা যে ভয়ঙ্কর চটেছেন, সেই ‘ফিডব্যাক’ তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক মতুয়া ও নমঃশূদ্র পরিবারকে পরিষেবা দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছি। তৃণমূলের দয়ায় ওরা বেঁচে নেই। ভারতে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তারজন্য নাগরিকত্ব আইনকে ধন্যবাদ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি শপথ নিলে আরও বেশি পরিষেবা পাবেন মতুয়া ও নমঃশূদ্ররা।’ এর অর্থ, ভোট পাওয়ার লোভে ফের ঝোলানো হল ‘গাজর’। 
মতুয়ারাও বুঝতে পারছেন, এই নির্বাচনেও নাগরিকত্বের ‘গাজর’ ঝুলিয়ে ফের ভোট নেওয়ার ফন্দি আঁটছে বিজেপি। সেই গাজর চকচকে ও আকর্ষণীয় করার জন্য হয়তো রঙে ডোবানো হবে। এমন কিছু চটকদারি ঘোষণা করা হবে, যাতে ফের মতুয়ারা তাদের ফাঁদে পা দেন। কিছু না করলে বিজেপিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেতে হবে। সেটা বিজেপি কিছুতেই চাইবে না। তাই অপেক্ষা আবার নতুন কোনও গিমিকের। এই সব চর্চার মধ্যেও একটা প্রশ্ন জোরদার হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী রানাঘাটে নামলেন না কেন?
দায়ী নাকি দৃশ্যমানতা! কিন্তু, সত্যিই কি তাই? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী যে কপ্টারে সফর করেন তা অত্যাধুনিক। মামুলি কুয়াশা কপ্টার ল্যান্ডিংয়ে বাধা হতে পারে না। তারপরেও নামলেন না কেন? অনেকে বলছেন, সেদিন সভাস্থলে যাঁরা ভিড় করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে তাঁরা একটা কথাই শুনতে চেয়েছিলেন, ‘সমস্ত মতুয়াকে দেওয়া হবে নাগরিকত্ব।’ সেই ঘোষণা না করলে সভাস্থলেই শুরু হত প্রবল বিক্ষোভ। তার ইঙ্গিত ছিল ২০ তারিখ সকালে পড়া পোস্টারে, ‘বিজেপির ফতুয়া খুলে নেবে মতুয়া।’ প্রধানমন্ত্রীর সভায় মতুয়ারা বিক্ষোভ দেখালে বিপাকে পড়ত বঙ্গ বিজেপি। সেই আশঙ্কাতেই কি প্রধানমন্ত্রী রানাঘাট এড়ালেন? তাই জাগছে সন্দেহ, রানাঘাটে না নামার কারণ দৃশ্যমানতা, নাকি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ