পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: দেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্পে পাট্টা ও পুনর্বাসন দুর্নীতি নিয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা পড়ল জেলা প্রশাসনের কাছে। সেই রিপোর্টেই উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভুয়ো নথি তৈরি করে, অবৈধ উপায়ে এবং পরিচয় গোপন করে পাট্টা হাতিয়ে সরকারি চাকরি ও আর্থিক প্যাকেজ লুটেছেন, এমন প্রায় ৫০জন প্রাপক এখন প্রশাসনের আতসকাচের নীচে। এঁদের সিংহভাগই ইতিমধ্যেই সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। বাকিদের নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, দেউচা-পাচামি-দেওয়ানগঞ্জ-হরিণসিঙা (ডিপিডিএইচ) প্রকল্প এলাকায় ১নম্বর খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত সরকারি খাসজমিতে মোট প্রায় ৪০০জনকে পাট্টা দেওয়া হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তি জারির পর ওই এলাকায় জমি কেনাবেচা বা পাট্টা প্রদান সম্পূর্ণ বেআইনি। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞপ্তি জারির পর অন্তত ১৮৫টি পাট্টা বিলি করা হয়েছে। কিছুদিন আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রামপুরহাটের প্রশাসনিক বৈঠক থেকে অবৈধ পাট্টা প্রাপকদের চাকরি বাতিলের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এরপরই জেলাশাসক ধবল জৈনের নির্দেশে গঠিত ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি এই দুর্নীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করে।
তদন্তে পাট্টা বিলির অভিনব সব দুর্নীতির কৌশল সামনে এসেছে। যেমন, ভিনজেলার এক বাসিন্দা, যিনি একসময় মহম্মদবাজারের একটি ক্র্যাশারের ম্যানেজার ছিলেন, তিনি এক স্থানীয় বয়স্ক মহিলাকে নিজের ‘স্ত্রী’ সাজিয়ে জয়েন্ট পাট্টা হাতিয়েছেন। জালিয়াতি নিখুঁত করতে পঞ্চায়েতের স্ট্যাম্প ও প্রধানের সই নকল করে ভুয়ো রেসিডেন্স সার্টিফিকেট তৈরি করেন। এমনকী, ওই ব্যক্তির আধার কার্ডেও মহম্মদবাজারের ভুয়ো ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসআইআরের পর ভোটার লিস্টে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি আদতে অন্য জেলার ভোটার। অথচ এই ভুয়ো পাট্টার বিনিময়েই তিনি পুলিশের কনস্টেবল পদে দিব্যি চাকরি বাগিয়েছেন।
দুর্নীতির জাল যে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়েছিল, তার প্রমাণ মেলে অন্য ঘটনাগুলিতেও। দেখা গিয়েছে, সরকারি খাতায় যে জমির শ্রেণি ‘রাস্তা’ হিসেবে চিহ্নিত, সেই জমিও পাট্টা হিসেবে বিলি করে দেওয়া হয়েছে। অন্য একটি ক্ষেত্রে, এক আদিবাসী মহিলাকে ভিন ধর্মের পরিচয় দিয়ে পাট্টা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সেই পাট্টার ভিত্তিতে খাতায়-কলমে ‘ভাইপো’ সেজে সরকারি চাকরি ও প্যাকেজ হাতিয়ে নিয়েছে এক অ-আদিবাসী যুবক। তদন্তে এসব সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বয়ান রেকর্ড হয়েছে। কমিটির আরও দাবি, এলাকার বাসিন্দা নন, এমন পাট্টা প্রাপকের সংখ্যাও বহু। এই বেআইনি কাজে তৎকালীন বিএলএলআরও, এসডিও এবং এসডিএলএলআরওর মতো পদস্থ কর্তাদের সরাসরি অনুমোদন ও সই ছিল।
এই রিপোর্ট জমা পড়ার পর প্রশাসনের অন্দরেই শোরগোল পড়েছে। ভূমিদপ্তরের এক পদস্থ কর্তা বলেন, বিজ্ঞপ্তি জারির পর কোনোভাবেই পাট্টা দেওয়া যায় না। অথচ তৎকালীন প্রশাসনের মদতেই দিনের পর দিন এই কাজ হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, ভুয়ো পাট্টা প্রাপকদের চাকরি হয়তো বাতিল হবে, কিন্তু তৎকালীন যেসব শীর্ষ আধিকারিক যুক্ত ছিলেন তাঁদের বিরুদ্ধে কি কড়া আইনি পদক্ষেপ করবে সরকার? নাকি শাস্তির খাঁড়া নামবে শুধুই সাধারণ প্রাপকদের উপর? চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখন রাজ্য সরকারের কোর্টেই বল ঠেলেছে জেলা প্রশাসন।