বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: কৌশিকী অমাবস্যার রাতে রামপুরহাট স্টেশন চত্বরে অলৌকিক শক্তি অর্জনের লোভে সাধু খুনের ঘটনায় শিউরে উঠেছেন সকলে। সেই নৃশংস ঘটনার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আসন্ন কালীপুজোর অমাবস্যায় তারাপীঠ মহাশ্মশান ও সংলগ্ন চত্বরের নিরাপত্তা বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। অমাবস্যার রাতে তন্ত্রসাধনার নামে যাতে আর কোনো অপ্রীতিকর বা অপরাধমূলক ঘটনা না ঘটে, তার জন্য নেওয়া হচ্ছে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। জেলা পুলিশ সুপার বিদিত রাজ ভূন্দেশ বলেন, অমাবস্যায় মহাশ্মশানে পর্যাপ্ত পুলিশি ব্যবস্থা থাকবে।
পুলিশ সূত্রের খবর, মহাশ্মশানের বিস্তৃত এলাকায় পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ফাঁক থেকে গিয়েছে। ঘন অন্ধকার ও নির্জনতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা যাতে পার না পেয়ে যায়, সে কথা মাথায় রেখে এবার কালীপুজোয় অমাবস্যা তিথিতে মহাশ্মশান চত্বরে ২৪ ঘণ্টা টানা পুলিশ মোতায়েন থাকবে। শ্মশানের প্রতিটি প্রবেশ ও প্রস্থান পথে পুলিশ কর্মীরা নজরদারি চালাবেন। থাকবে বিশেষ নজরদারি টিম। অমাবস্যার রাতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধু-সন্ন্যাসী ও পুণ্যার্থীদের ভিড়ের সুযোগ নিয়ে বহিরাগত কোনো সন্দেহভাজন এলাকায় ঢুকেছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিনয়ত নজরদাবি চালাবে এই টিম। শ্মশান চত্বরে নতুন কোনো সাধু এলে বা দীর্ঘক্ষণ সন্দেহজনকভাবে কেউ বসে থাকলে তাঁদের পরিচয়পত্র খতিয়ে দেখা হবে।
কৌশিকী অমাবস্যার রাতে রামপুরহাট স্টেশন চত্বরে ফল ব্যবসায়ী তথা সাধু মনোরঞ্জন স্যান্ডেলকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল বিহারের পাটনার বাসিন্দা রীতেশ প্রকাশ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, রক্ত দিয়ে তন্ত্রসাধনা করে শক্তি সঞ্চয়ের জন্যই সে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল এবং কালীপুজোর অমাবস্যার আগে পুনরায় তারাপীঠে ফিরে আসায় একই ধরনের মতলব ছিল বলে মনে করছেন অনেকে। বর্তমানে অভিযুক্ত পুলিশ হেফাজতে থাকলেও কালীপুজোর রাতে কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ প্রশাসন। সেবাইতদের একাংশের মতে, পুলিশের এই বিশেষ পদক্ষেপ লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর মনে আস্থা জোগাবে।
তবে শ্মশান এলাকার কিছু কাঠামোগত খামতি নিয়ে সরব হয়েছেন মন্দির কমিটির সভাপতি নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, কয়েক বছর আগে টিআরডিএ-র পক্ষ থেকে মহাশ্মশান চত্বরে সাধুদের থাকার জন্য প্রায় ৫০টি ঘর তৈরি করা হলেও সেখানে কারা থাকেন বা আসেন, তার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা পরিচয়পত্র মন্দির কমিটি, পুলিশ বা টিআরডিএ—কারো কাছেই নেই। বিষয়টি নিয়ে পুলিশকে তালিকা তৈরির অনুরোধ জানানো হলেও তা এখনও মেলেনি।
এ ছাড়া শ্মশানের বিভিন্ন সরু গলি দিয়ে অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই কালীপুজোর পর মন্দির চত্বর সংস্কারের পর বেঁচে যাওয়া লোহার রেলিং দিয়ে গলিগুলি আপাতত ঘিরে দেওয়া হবে। পাশাপাশি শ্মশানের ৩টি মূল প্রবেশ পথে উন্নতমানের সিসিটিভি ক্যামেরা বসনো হবে।
অতীতেও তারাপীঠ শ্মশানকে অপরাধীরা আত্মগোপনের স্থান হিসেবে ব্যবহার করেছে তার নজির রয়েছে। হুগলির মগড়া থানার এক নাবালিকা ধর্ষণ কাণ্ডে অভিযুক্ত অশোক পাল সাধু সেজে ২ বছর ধরে এখানে লুকিয়ে ছিল, যাকে পরবর্তীতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
এছাড়া বছর দুয়েক আগে সিভিক ভলান্টিয়ার নিরঞ্জন দাসের রহস্যজনক মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল এই শ্মশান থেকেই। তাই অতীতের এসব ঘটনা ও সাম্প্রতিক সাধু খুনের কথা মাথায় রেখে এবার কালীপুজোয় তারাপীঠের মহাশ্মশানকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে মুড়ে ফেলতে মরিয়া প্রশাসন।



