কৌশিক ঘোষ, কলকাতা: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত ‘ল্যাংটাং লিরুং’ পর্বতের ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় বিশাল হিমবাহের ধস নামার জেরে বুধবার নেপালের প্রলয় কাণ্ডটি ঘটেছে। মত বিশেষজ্ঞদের। ভূমিকম্প, গ্লোবাল ওয়ার্মিং না অন্যকোনো ভূতাত্ত্বিক কারণে হিমবাহে ওইরকম ধস নামল সেটাই এখন বড়ো প্রশ্ন। দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছিল, ওই এলাকায় রিখটার স্কেলে ৪.৪ তীব্রতার ভূমিকম্পের জেরে এই ঘটনাটি ঘটেছে। কিন্তু ভূমিকম্প সংক্রান্ত বিশ্বের সবথেকে বড়ো সংস্থা আমেরিকার জিয়োলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই ব্যাপারে তাদের বক্তব্য সংশোধন করে। ওই জায়গার স্যাটেলাইট চিত্র, দীর্ঘ সময়কালীন ভূকম্পন প্রভৃতি বিশ্লেষণ করেছে তারা। তারপর জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ওই জায়গায় ৫.২ তীব্রতার কম্পনটি অনুভূত হয়েছিল বিশাল হিমবাহসহ ধ্বংসস্তূপ নীচে আছড়ে পড়ার কারণে। প্রকৃত ভূমিকম্প বলতে যা বোঝায়, সেটা ওখানে হয়নি। এই পরিস্থিতিতে হিমবাহ থেকে এত বড়ো মাপের তুষারধসের জন্য গ্লোবাল ওয়ার্মিং, কাছাকাছি এলাকায় বেপরোয়া নির্মাণ কাজ চলা প্রভৃতিকেও সম্ভাব্য কারণ হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
জিএসআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত ডিরেক্টর শিখেন্দ্র দে জানান, ভূমিকম্প থেকে হিমবাহে ধস নামেনি, ইউএসজিএস একথা বলে দেওয়ার পর এনিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। ভূমিকম্প সংক্রান্ত ব্যাপারে তারা সবথেকে দক্ষ। হিমবাহটি গলতে থাকায় তার বিশাল তুষারের ভার ধরে রাখতে না-পারায় তা নীচে নেমে এসেছে। সিকিম, উত্তরাখণ্ডসহ হিমালয়ের বিভিন্ন জায়গায় হিমবাহ ধসের জেরে ‘গ্লেসিয়ার লেক আউটবার্স্ট ফ্লাডের’ (জিএলওএফ) জন্য সাম্প্রতিক অতীতে একাধিক বড়ো ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। হিমবাহধসের অন্যতম কারণ হিসাবে অনেকদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা বিশ্ব উষ্ণায়নকে দায়ী করছেন। এখানেও সেরকম কিছু হতে পারে। প্রসঙ্গত, গতবছর আগস্ট মাসে ওই সীমান্ত এলাকায় চীনের গিয়েরং কাউন্টিতে জিএলওএফ বিপর্যয় হয়। তাতে নেপালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বেশ কয়েকজন মারাও যান।
কানাডার ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডান শুগার, ইংল্যান্ডের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হেনরিখ রিচ, আমেরিকার টেকসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের নদী বিশেষজ্ঞ হাতিম শরিফ প্রমুখ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জেরে নেপালে হিমবাহের তুষারধস নামার সম্ভাবনাই সবথেকে বেশি। ওই এলাকায় নির্মাণ কাজ চলা, হিমবাহের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনও ধসের কারণ হতে পারে।
ডান শুগার জানান, স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়েছে যে ওই পর্বতের হিমবাহগুলির বরফ কয়েকদিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গিয়েছে। এই ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সংঘটিত গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের দিকেই ইঙ্গিত করছে। সমীক্ষা রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপাল হিমালয়ে পর্বতগুলিতে কয়েকবছরের মধ্যে বরফের মাত্রা ব্যাপক মাত্রায় কমে গিয়েছে। ভারত ও চীন, দুই বড়ো দেশে দূষণের জেরে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নির্গমনের কারণেই হচ্ছে এই কাণ্ড।