সুকান্ত বসু, কলকাতা: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে রাখি বন্ধন পালন হয়েছিল বাগবাজারের বসু বাটিতে। সেটি কলকাতার একটি হেরিটেজ ভবন। তবে স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু ইতিহাসের সাক্ষী সে বাড়ি আজ ভগ্নপ্রায়। মনে হয় যে কোনো মুহূর্তে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়তে পারে। এককালের জমকালো স্থাপত্য, চোখ ধাঁধানো ভাস্কর্যে মোড়া সে ভবন এখন গ্রাস করে নিয়েছে বটগাছ। আগাছা ভর্তি সর্বত্র। বটের বিশাল বিশাল ঝুরি ময়াল সাপের মতো গিলছে ইট-কাঠ-কংক্রিট। বাগবাজার জনাকীর্ণ এলাকা। কিন্তু বসু বাটি থাকে নির্জন। গা ছমছমে পরিবেশ। পায়রা ওড়ে। সর্বদাই খসে পড়ে পলেস্তারা। কাচের জাফরি ভেঙে চুরমার। প্রতিটি কাঠের দরজা, জানলা ও কড়ি বরগা পুরোপুরি ধ্বংসের পথে। কলকাতা পুরসভা ‘বিপজ্জনক’ বলে একটি বোর্ড বসিয়েছে। একটি দেওয়ালে লাগানো বোর্ডটি। তাতে লেখা, ‘পশুপতি বসু ও নন্দলাল বসু হাউস’। বাগবাজার স্ট্রিটের উপর আর একটি ফলক রয়েছে। তাতেও অযত্নের ছাপ। বোর্ডে লেখা, ‘লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ চক্রান্তের বিরুদ্ধে পরাধীন বাঙালির মনন ও আবেগ সংহত হয়েছিল এক সর্বব্যাপী আন্দোলনে। সে আন্দোলন প্রতীকী মাত্রা পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যান্য বিশিষ্ট মানুষের আহ্বানে হওয়া রাখি বন্ধনে। (১৯০৫ সালে ১৬ অক্টোবর) রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে সেদিন সুবিশাল মিছিল পৌঁছয় বাগবাজারের বসু বাটিতে। রাখি বন্ধন হয়। গঠিত হয় জাতীয় তহবিল।’ এখন ফলকের চারপাশে নোংরা‑আবর্জনা। বোর্ডটি ঝড়‑জলে ভেঙে পড়তে পারে অবস্থা। স্থানীয় মানুষ বহুবার বোর্ড সংস্কারের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু পুরসভায় দরবার করে কোনো কাজ হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, ‘ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ভবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বড়োই উদ্বেগের বিষয়। বাড়ি সংস্কার করা জরুরি। না হলে শহর থেকে একটি আস্ত হতিহাস হারিয়ে যাবে।’ জগৎ মুখার্জি পার্ক উদ্যান মুক্ত গ্রন্থাগারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা সত্যরঞ্জন দলুই বলেন, ‘বসু বাটির দৈন্যদশা মনকে পীড়া দেয়। রক্ষা করতে দ্রত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’ এদিকে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ বাগবাজার তো বটেই শ্যামবাজার, গড়িয়াহাট, সল্টলেক থেকে গড়িয়া সর্বত্র রাখির বাজার তুঙ্গে উঠেছে। বাজারে ঘুরলে চোখে পড়ে এবার লাল গোলাপের রাখির চাহিদা বেশ ভালো। প্রথম দেখলে মনে হবে তাজা গোলাপ। কিন্তু হাতে নিলে ভুল ভাঙবে। সেগুলি নকল। বিডন স্ট্রিট ও শ্যামবাজারের রাখি ব্যবসায়ী পরেশ সাহা ও গোপাল দাস বলেন, ‘বৃষ্টির জন্য ব্যবসা ডাউন যাচ্ছিল। সোমবার থেকে বাজার উঠছে।’ বাগবাজারে স্বপন মুখোপাধ্যায় নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘গোলাপ রাখি কিনলাম। কি সুন্দর রং। এদিকে দেখুন বসু বাটির কি ভয়ানক দশা! এটিও যদি রঙিন করে তুলত সরকার। বাঙালির ইতিহাস বাঁচত।’



