নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শনিবার বিকেল সওয়া ৩টে। বন্ডেল রোডের দে’জ মেডিক্যালের কারখানা থেকে ভেসে এল আর্তনাদ—‘আগুন লেগেছে, আমাদের বাঁচান’। কারখানার উপর ধোঁয়ার কুণ্ডলী। কিছুক্ষণের মধ্যে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। গোটা চত্বর জুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। টানা প্রায় ৫ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে দমকলের ১১টি ইঞ্জিন। ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এক দমকলকর্মী। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওষুধ কারখানায় বিভিন্ন রাসায়নিক মজুত ছিল। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাসায়নিকের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এলাকার কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা।
১৯৪১ সালে বাঙালি উদ্যোগপতি ভূপেন্দ্রনাথ দে’র হাত ধরে নামকরা ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা দে’জ মেডিক্যালের পথ চলা শুরু হয়েছিল। শনিবার দুপুরে গড়িয়াহাট থানা এলাকায় এই সংস্থার বহু পুরনো কারখানায় আগুন লাগে। ভস্মীভূত হয়ে যায় গোটা বাড়িটি। প্রথমে আগুন লাগে একতলায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দোতলায় আটকে পড়েন কারখানার তিন শ্রমিক। প্রথমে দমকলের চারটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পরে আরও দুই ধাপে আসে দমকলের সাতটি ইঞ্জিন। আসেন গড়িয়াহাট থানা ও কলকাতা পুলিসের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা। ততক্ষণে কারখানার নীচের তল পুরোটাই দাউদাউ করে জ্বলছে। ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে অনেকের। এই পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করেই আটকে থাকা তিন শ্রমিককে কোনওরকমে উদ্ধার করেন দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলার কর্মীরা।
আগুনের উৎসস্থলে পৌঁছতেই দমকলের সময় লেগে যায় প্রায় দেড় ঘণ্টা। কারখানায় নিজস্ব কোনও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যা আরও বাড়ে। অবস্থানগত কারণে দমকলের গাড়ি তো বটেই, কর্মীদেরও অকুস্থল পর্যন্ত পৌঁছতে বিস্তর ঝক্কি পোহাতে হয়। স্থানীয় ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার নিবেদিতা শর্মা ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘বহু পুরনো কারখানা এটি। দমকলের গাড়ি ভিতরে ঢোকার মতো পরিস্থিতি নেই। তাই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা সময় লেগেছে।’ কারখানার পাশের দু’টি গলি দিয়ে দমকলের চারটি গাড়ি কাজ শুরু করে। একতলার জানালা দিয়ে জল ছড়িয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চলে। এসবের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে উপরের দু’টি তলেও। পাশের একটি বাড়িতে আগুনের হল্কা লাগে। বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। সেই বাড়ি থেকে শিশু ও প্রবীণদের নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়। কালো ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারান দুই বৃদ্ধা।
দীর্ঘক্ষণ ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে ‘ফায়ার ফাইটার’ মনোজ সাউ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু বলেন, ‘মনোজবাবুকে বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। তাঁর প্রবল শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। তবে এখন তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।’ দে’জ মেডিক্যালের এক কর্তা বলেন, ‘আগুন লাগার কারণ খতিয়ে দেখছে পুলিস ও দমকল। আমাদের তিনজন শ্রমিক আটকে ছিলেন। তাঁদের উদ্ধার করা গিয়েছে। হতাহতের কোনও খবর নেই। ক্ষয়ক্ষতি কত হয়েছে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।’