রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: জেলাজুড়ে হাতির সমস্যা রয়েছে। হাতির দলের হানায় ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছেই। কিন্তু হাতির চেয়েও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নাবালিকা বিয়ে। তাতেই ঘুম উড়েছে প্রশাসনের আধিকারিকদের। কারণ জেলাজুড়ে নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। বর্তমানে এই পরিসংখ্যান কমিয়ে আনাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসনের। নাবালিকাদের বিয়ের সংখ্যা কমাতে জেলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন স্বয়ং জেলাশাসক। প্রশাসনের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, আগের তুলনায় জেলায় নাবালিকাদের বিয়ের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু আরও কমানো দরকার। আগামী অর্থবছরে নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা কমিয়ে ৫০ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে কোনও নাবালিকার বিয়ের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলেই নেওয়া হবে কড়া পদক্ষেপ। কেশপুর, গড়বেতা, শালবনী, গোয়ালতোড়, নারায়ণগড়, বেলদা, দাঁতন সহ জেলার একাধিক ব্লকে এই সমস্যা রয়েছে। গ্রামীণ এলাকার স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া, এই সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জানা গিয়েছে, একসময় নাবালিকার বিয়ের সংখ্যা ছিল ১৫ থেকে ১৭ হাজার। বহু চেষ্টায় সেই সংখ্যা কমেছে। জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি বলেন, নাবালিকা বিয়ে নিয়ে লাগাতার প্রচার চালানো হচ্ছে। আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। কন্যাশ্রীরা ময়দানে রয়েছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে মেয়েরা নিজেদের বিয়ে রুখে দিচ্ছেন। গ্রামীণ এলাকার মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। এই ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রসঙ্গত, জেলা জুড়ে দিনেদিনে বাড়ছে নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা। এরসঙ্গে জেলাজুড়ে বিপুল পরিমাণে টিনএজ প্রেগন্যান্সির ঘটনাও ঘটছে। তবে গত এক বছর ধরে প্রশাসনের তরফে লাগাতার প্রচার চালানো হচ্ছে। জেলায় প্রত্যন্ত এলাকার বিভিন্ন স্কুলে ক্যাম্প করেও চলছে প্রচার। একাজে পুলিসের তরফেও সহযোগিতা করা হচ্ছে। এরফলে নাবালিকা বিয়ে রুখে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
জানা গিয়েছে, ২০২১-২২ সালে ৫৭ জনের বিয়ে রুখে দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। সেই বছর নাবালিকা বিয়ের সংখ্যাও ছিল বেশি। পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে এই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮-তে। এরপর ২০২৩-২৪ সালে ৯৯ জন নাবালিকার বিয়ে রুখে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জেলা প্রশাসন। চলতি বছরে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৪৪ জন নাবালিকার বিয়ে রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। একইসঙ্গে জেলায় টিনএজ প্রেগন্যান্সির সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে। প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, ২০২২-২৩ এর তথ্য খতিয়ে দেখে ব্লক ধরে ধরে পর্যালোচনা হয়েছে। ওই বছরে জেলায় সাড়ে ১১ হাজার নাবালিকার বিয়ে হয়েছে। তার মধ্যে এগিয়ে কেশপুর সহ একাধিক ব্লক। সচেতনতা বেড়েছে বলেই এখন নাবালিকারা নিজেরাই বিয়ে রুখছে। কিছু নাবালিকা বিয়ে বন্ধ করা যাচ্ছে। কিন্তু সব বিয়ে বন্ধ করা যাচ্ছে না। অনেক বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর খবর আসছে। প্রত্যন্ত এলাকায় কমিউনিকেশন ও সহযোগিতার অভাব, একটা বড় কারণ। পাশাপাশি জন প্রতিনিধিরাও এবিষয়ে উদাসীন। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, জনপ্রতিনিধিরা বিষয় সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও নাবালিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এনিয়ে কেশপুর ব্লকের বাসিন্দা কুণাল সাহা বলেন, অনেক নাবালক, নাবালিকার বাড়ির সদস্যদের বিয়ে হয়েছে নির্দিষ্ট বয়সের আগেই। তাই তাঁরাও চাইছেন, তাঁদের সন্তানদের একইভাবে বিয়ে হোক। কড়া পদক্ষেপ না নিলে, নাবালিকা বিয়ে আটকানো কঠিন।