স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ মার্গারেটের জীবনের অসাধারণ ঘটনা। কারণ এই সাক্ষাতের ফলে তাঁর জীবনের গতি সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়। মার্গারেট তাঁর স্বলিখিত ‘The Master As I Saw Him’ পুস্তকে এই প্রথম দর্শন সম্বন্ধে বেশ সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। সেদিন নভেম্বর মাসের (১৮৯৫) এক রবিবারের মনোরম অপরাহ্ন। ইংলণ্ডের ওয়েস্ট-এন্ড নামক স্থানে একটি ড্রয়িংরুমে ‘হিন্দুযোগী’ স্বামী বিবেকানন্দকে দেখবার ও তাঁর কথা শোনবার জন্য মাত্র পনেরো-ষোলো জন অভ্যাগত উপস্থিত। তাঁরা অর্ধবৃত্তাকারে উপবিষ্ট। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁদের দিকে মুখ করে বসে আছেন। তাঁর পেছনে অগ্নিকুণ্ডে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি। একটি ঘরোয়া ক্লাস। মার্গারেট যথাসময়ে ঘরে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করলেন। এই প্রথম দর্শনের স্মৃতি মার্গারেটের মনে বিশেষভাবে অঙ্কিত ছিল। তাঁর মনে হত, এর সঙ্গে প্রাচ্য জীবনের যেন একটা সাদৃশ্য ছিল। ভারতে প্রায়ই দেখা যায়, কোনও উদ্যানে, অথবা সূর্যাস্তকালে কূপের সমীপে, কিংবা গ্রামের উপকণ্ঠে বৃক্ষতলে এক সাধু উপবিষ্ট এবং তাঁর চারিপাশে সমাবেত শ্রোতৃবৃন্দ। সেদিনকার পরিবেশ প্রাচ্যদেশের এইরূপ এক দৃশ্যেরই যেন রূপান্তর!
সন্ন্যাসীর পরিধানে গৈরিক পরিচ্ছদ, আকৃতি উজ্জ্বল ও বীরত্বব্যঞ্জক, প্রবল ব্যক্তিত্বপূর্ণ আয়ত নয়ন আর প্রশান্ত মুখমণ্ডল। ক্রমে অপরাহ্ন শেষ হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে এল। নানা প্রশ্নের উত্তরে সন্ন্যাসী প্রায়ই সংস্কৃত শ্লোক সুর করে আবৃত্তি করছিলেন। আবার মাঝে মাঝে তিনি আপনার মনে ‘শিব!’ ‘শিব!’ বলে উঠছিলেন। মার্গারেটের কাছে সবই নতুন, তাই তিনি খুব বিস্ময়বোধ করছিলেন। স্বামীজী সেদিন হিন্দুধর্ম ও দর্শন সম্বন্ধে বহু আলোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রাচ্য ও পাশ্চত্যের মধ্যে আদর্শ বিনিময়ের সময় এসেছে এবং সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর পাশ্চাত্যে আগমন। স্বামীজী যে-সব বিষয় আলোচনা করেন তার মধ্যে ‘সকল ধর্মই একদিক দিয়ে দেখতে গেলে সমভাবে সত্য’ এই কথাটি সকলের কাছেই নতুন হলেও যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়েছিল। স্বামীজীর বাণী মার্গারেটকে আকৃষ্ট করলেও অন্যান্য সকলের মতো তিনিও প্রথমে ভেবেছিলেন তার মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। কিন্তু সত্যই কি হিন্দুযোগী কোনও নূতন বার্তা বহন করে আনেননি? পরে মার্গারেটের মনে হয়েছিল, এই হিন্দুযোগী যা কিছু বলেছেন, তিনি পূর্বে হয়তো ওইরূপ কথা শুনে বা ভেবে থাকতে পারেন; কিন্তু এটা ঠিক, এ পর্যন্ত এমন কোনও ব্যক্তির দর্শন তিনি পাননি, যিনি মাত্র একঘণ্টার মধ্যে যা কিছু শ্রেষ্ঠ ও উৎকৃষ্ট বলে মার্গারেটের মনে হয়েছে তাকে এমন সুন্দর করে প্রকাশ করতে পারেন।
প্রব্রাজিকা অমলপ্রাণা প্রকাশিত ‘ভগিনী নিবেদিতা’ থেকে