নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও তমলুক: দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বাংলা, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশার ‘ওয়ান্টেড’ তালিকার শীর্ষে থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত সিপিআই (মাওবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ পুলিশের জালে। ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা পুলিশ তাঁর মাথার দাম ধার্য করেছিল মোট ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। বৃহস্পতিবার ভোরে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের মণিনাথপুরে শ্বশুরবাড়ি থেকে কলকাতা পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছে তাঁকে। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা থানার ফুলচক গ্রামের বাসিন্দা আকাশ ছিলেন মাওবাদীদের রাজ্য কমিটির সম্পাদকও। কিষেনজির মৃত্যুর পর বাংলা-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা রিজিওনাল কমিটির দায়িত্ব বর্তেছিল তাঁর কাঁধে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষিত ‘মাও মুক্ত ভারত’ অভিযান চলাকালীন মাওবাদীদের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে আকাশই ছিলেন একমাত্র সদস্য, যিনি আত্মসমর্পণে রাজি না হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। সূত্রের খবর, চরম আর্থিক সংকটের জেরে টাকা জোগাড়ের লক্ষ্যেই শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলেন তিনি। শীর্ষ এই মাওবাদী নেতার গ্রেপ্তারির পর এক্স-হ্যান্ডলে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর হুঁশিয়ারি—‘লাল সন্ত্রাসকে কোনোভাবেই মাথাচাড়া দিতে দেওয়া হবে না।’
সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, ঝাড়খণ্ডের সারান্ডার জঙ্গলে দেহরক্ষী মঙ্গল সিং সর্দার এবং তার স্ত্রী মালতী মুর্মুর হেপাজতে নিজের সর্বক্ষণের সঙ্গী একে-৪৭ রাইফেল এবং গোলাবারুদ রেখে ছদ্মবেশে পটাশপুর এসেছিলেন আকাশ। সম্প্রতি আকাশ স্কোয়াডের তিন সদস্য শচীন, মিতা ও বুলু গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে নজরদারি বাড়িয়েছিলেন গোয়েন্দারা। খবর আসে, সারান্ডার জঙ্গলের ডেরা ছেড়ে বেরিয়েছেন মাওবাদীদের রাজ্য কমিটির সম্পাদক। ১৮ বছর পরে শ্বশুরবাড়িতে এসেই তিনি পুলিশের জালে ধরা পড়ে যান। ৬৪ বছর বয়সি আকাশ উচ্চ রক্তচাপ এবং কোমরের ব্যথায় এই মুহূর্তে কার্যত কাবু হয়ে রয়েছেন। তাঁর স্ত্রী অণু ওরফে কল্পনা মাইতিও মাওবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। গত ২০১০ সালে হাওড়া থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন জেলে রয়েছেন তিনি।
সিপিআই (মাওবাদী) বিরোধী অভিযানের সঙ্গে যুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের কথায়, গত শতাব্দীর আটের দশকে নকশাল সংস্পর্শে আসেন চন্দ্রকোনার বাসিন্দা অসীম মণ্ডল। যুক্ত হন জনযুদ্ধ বা পিপলস ওয়ার গ্রুপের (পিডব্লুজি) সঙ্গে। এরপর ২০০৪ সালে এমসিসি এবং পিডব্লুজি একত্র হয়ে সিপিআই (মাওবাদী) গঠিত হলে, কিষেনজির সংস্পর্শে আসেন তিনি। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় মাওবাদীদের সশস্ত্র বাহিনী পিএলজিএ’র দায়িত্ব পান। কিষেনজির মৃত্যু এবং তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক গড়বেতার সুদীপ চোংদার ওরফে কাঞ্চন গ্রেপ্তার হওয়ার পর সংগঠনের দায়িত্ব বর্তায় অসীমের উপর। সংগঠনে তাঁর নাম হয় ‘আকাশ’। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, মূলত ঝাড়খণ্ডের গুড়বান্দা এবং সারান্ডাকে ‘বেস’ বানিয়ে যাবতীয় মুভমেন্ট ও অপারেশন ছিল আকাশ স্কোয়াডের। গত জানুয়ারি মাসের ২২ তারিখ গুড়বান্দার জঙ্গলে সিআরপি’র সঙ্গে সংঘর্ষে স্কোয়াডের ১৫ জন সদস্য ‘খতম’ হওয়ার পর থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন সহায়-সম্বলহীন আকাশ ওরফে অসীম মণ্ডল।