আমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বিমানবন্দর থেকে বি জে মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলের দূরত্ব মেরেকেটে ১১ কিলোমিটার। দীর্ঘ রানওয়ে দিয়ে প্রবলবেগে ছুটে এসে আকাশের পথে পাড়ি দেওয়া কোনও বিমানের ওইটুকু যেতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগে। এই সময়টুকুতে যাত্রীরা হয়তো সিটবেল্ট খুলে আরাম করে বসারও সুযোগ পান না। কিন্তু সেই অবসরেই লেলিহান আগুনে ঝলসে দলা পাকিয়ে গেল শরীরগুলো! ভয়াল আগুনের গ্রাসে খাক হয়ে গেল শুধু অভিশপ্ত বিমানের যাত্রীরা নন, দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে কয়েকজন মেডিক্যাল পড়ুয়া ও সাধারণ মানুষেরও। তবে এই মৃত্যুমিছিলে ফিনিক্স পাখির মতো একজন যাত্রী বেঁচে গিয়েছেন। নিজের রাজ্য গুজরাতে এই ভয়াবহ বিশাল দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমেদাবাদ পৌঁছতে দেরি করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ইতিহাসের পাতায় ঢুকে পড়া এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সঙ্গত কারণেই একাধিক সংস্থা তদন্তের জন্য মাঠে নেমে পড়েছে। আমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার (এআই ১৭১) বিমানের মালিক সংস্থা মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছে। ইতিমধ্যে বিমানের ‘ব্ল্যাক বক্স’ উদ্ধার হয়েছে। আশা করা যায়, অচিরেই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কোনও সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
সড়ক থেকে রেল, বিমান— যে কোনও দুর্ঘটনার পরই কাটাছেঁড়া শুরু হয়। এক্ষেত্রেও সেটাই শুরু হয়েছে। দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে নানা বিশেষজ্ঞের নানা মত সামনে আসছে। কেউ বলছেন, চিল-শকুনের মতো একঝাঁক পাখির ধাক্কায় বিমানের দুটি ইঞ্জিনই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জেরে দুর্ঘটনা। কারও মতে, আচমকা বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়াই দুর্ঘটনার কারণ। আবার কারও আশঙ্কা, যথেষ্ট অভিজ্ঞ হলেও হয়তো দুই পাইলটের কোনও তাৎক্ষণিক অসতর্কতার (হিউম্যান এরর) কারণেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কেউ কেউ দুর্ঘটনার পিছনে সন্ত্রাসবাদী কোনও সংগঠনের ‘হাত’ থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। অথবা অন্তর্ঘাত। ধন্দ তৈরি হয়েছে, কেন বিমান ‘টেক অফ’ করে ৬০০-৮০০ ফুট উচ্চতায় উঠে গেলেও পিছনের চাকা গুটিয়ে নেননি পাইলট! তবে কি যাত্রার শুরুতেই কোনও গণ্ডগোলের আঁচ পেয়ে বিমানটিকে দ্রুত ল্যান্ডিং করানোর অভিপ্রায় থেকেই পিছনের চাকা গুটিয়ে নেননি পাইলট? প্রশ্ন আরও। যাত্রা শুরুর আগে চেকিংয়ে কি ছিল কোনও গাফিলতি? আপাতত অনেককিছুই রহস্যে ঘেরা। তবে যে বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত, উড়ানের প্রায় শুরুতেই ‘মে ডে’ বার্তা পাঠানোয় বিমানটি যে বড়সড় কোনও বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল তা বোঝা যায়। এখন শোকে ভারাক্রান্ত সকলেই চান, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক। দেশের নামও যে এর সঙ্গে যুক্ত।
তবে আমেদাবাদে ড্রিমলাইনার বিমান দুর্ঘটনার পর আতসকাচের তলায় চলে এসেছে আমেরিকার বোয়িং বিমান নির্মাণকারী সংস্থা এবং এয়ার ইন্ডিয়ার মালিক টাটা গোষ্ঠীর ভূমিকা। বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিমান হিসেবে সুখ্যাতি আছে ড্রিমলাইনারের। গোটা বিশ্বে এই বিমান পরিষেবা চালু হওয়ার চোদ্দো বছর পর এবার দুর্ঘটনার সম্মুখীন হল আমেদাবাদে। কিন্তু বোয়িং সংস্থার দুই কর্মীর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ যেন বেআব্রু করে দিয়েছে সব কিছু। তাঁদের অভিযোগ, বিমানের ভিতরকার মনোরম সাজসজ্জা, খাবার ও যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে বোয়িং সংস্থা নিজেদের পিঠ চাপড়ালেও ড্রিমলাইনার ৭৮৭ তৈরির যন্ত্রাংশের গুণগত মান নিয়ে তাঁরা অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ, এই বিমানের অনেক যন্ত্রাংশ নিম্নমানের। ইঞ্জিন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণও নিয়ম মেনে নাকি হয় না। জানা গিয়েছে, সরকারি মালিকানাধীন থাকাকালীন ২০১১ সালে প্রথম ড্রিমলাইনার কেনে এয়ার ইন্ডিয়া। আরও ভালো পরিষেবা দিতে ২০২৩ সালে মালিকানার হাতবদল হয়ে এয়ার ইন্ডিয়া এখন টাটা গোষ্ঠীর সম্পদ। তথ্য বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত থাকাকালীন এয়ার ইন্ডিয়া মাত্র দু’বার বড় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়। কিন্তু বেসরকারিকরণের পর গত দু’বছরে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানের দুর্ঘটনার সংখ্যা ৮টি। বস্তুত শুধু ড্রিমলাইনার বিমান নিয়েই গত কয়েক বছরে গোটা বিশ্বে একাধিক অভিযোগ ও বিতর্ক উঠেছে। অভিযোগ উঠেছিল প্রযুক্তিগত ত্রুটি নিয়েও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদালতে একাধিক মামলাও হয়েছে। কোনও কোনও দেশ এই স্বপ্নের উড়ানকে নাকি নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। এই দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, ড্রিমলাইনারের মতো আধুনিক বিমানের যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে যতটা তৎপর কর্তৃপক্ষ, তার সিকিভাগও কি বিমানের নিরাপত্তা ও উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দেখা যায়? কারণ অভিযোগ, ২০২৫ সালের শুরু থেকে লাগাতার টেকনিক্যাল ফল্ট হয়ে চলেছে বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনারে। তাই এয়ারক্র্যাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো বিস্তারিত তদন্ত শুরু করতে চলেছে। তবে এই দুর্ঘটনাকে শুধু কারণ অনুসন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি বাকি দিকগুলি নিয়েও সরকার মাথা ঘামায় তাহলে দেশ ও দশের মঙ্গল। উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয় নয় তুর্কি যোগের আশঙ্কাটি। কারণ এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল পাকবন্ধু তুরস্কের একটি সংস্থা, যাদের মেন্টেন্যান্স থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নাকি চলতি মাসেই নিয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া। তাই তদন্তের আওতায় সবকিছুই থাকা দরকার।