নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: স্রোত হারিয়ে মৃতপ্রায় জলঙ্গি। নদীর গতিপথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁধাল, অবৈধ সেতু। আবার অনেক জায়গায় পলি পড়ে হারিয়ে গিয়েছে নদী। সেই মৃতপ্রায় জলঙ্গির অবস্থা খতিয়ে দেখতে কৃষ্ণনগরে এল ম্যাঞ্চেস্টার ইউনিভার্সিটির ২৫ জন গবেষকের একটি দল। নদীর চর ও সেখানকার বদলে যাওয়া ইকো সিস্টেম নিয়ে গবেষণা করতেই আসা তাঁদের। রবিবার কৃষ্ণনগর পুরসভার দ্বিজেন্দ্র মঞ্চে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। ‘সেভ জলঙ্গি’ সংস্থার তত্ত্বাবধানে হওয়া এই সেমিনারে নদী বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জলঙ্গি নদীর আশপাশের এলাকার মৎসজীবী, কৃষিজীবীদের সঙ্গেও আলোচনা করেন তাঁরা।
জানা গিয়েছে, গবেষক দলটি গাঙ্গেয় ডেল্টা অববাহিকা নিয়ে গবেষণা করছে। সেইমতো পশ্চিমবঙ্গে ভাগীরথী ও তার আশেপাশের এলাকা ঘুরে দেখছেন তাঁরা। গবেষণার অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নদীর চর এলাকাকে। সেইসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের এই নদী ও নদীর চর নিয়ে যে পুরনো ধারণা রয়েছে সেগুলোও জানতে চাওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে নদী সংলগ্ন পরিবেশকে কী করে আরও নদী বান্ধব করে তোলা যায়, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাতদিনের বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে গবেষক দলটি। কয়েকদিন আগেই সুন্দরবন থেকে ঘুরে এসেছেন তাঁরা। দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি হিসেবে কৃষ্ণনগরে জলঙ্গি নদীর আশেপাশের এলাকা ঘুরে দেখেন। জলঙ্গিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। বিগত কয়েক বছরে নদীর কী পরিবর্তন হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা। সেই কাজেই এদিন কৃষ্ণনগরের চর শম্ভুনগর পরিদর্শন করে গবেষক দলটি।
জানা গিয়েছে, বন্যার সময়ে দেশীয় প্রজাতির ধান চাষ নিয়ে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলা হয়। সেইসঙ্গে বন্যা হলে মানুষ আগে কোন ধরনের বাসস্থান নির্বাচন করত। পাশাপাশি বর্তমান বর্তমানে নদীর জল গ্রামে ঢুকলে কোন ধরনের বাসস্থান তাঁদের দেওয়া হয়, তাতে তাঁরা আদৌও লাভবান হন কিনা, এই সমস্ত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অর্থাৎ নদীকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের যে সমস্ত জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর অনুসন্ধান করা হয়।
‘সেভ জলঙ্গি’-র সদস্য শঙ্খশুভ্র চক্রবর্তী বলেন, ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের উদ্যোগে এই গবেষণা হচ্ছে। ডেল্টা অববাহিকা নিয়ে তাঁরা গবেষণা করছেন। নদীয়া জেলার অন্যতম নদী জলঙ্গি। তাই জলঙ্গির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে তাঁরা এসেছিলেন। গ্রামের মানুষজনের সঙ্গেও তাঁরা কথা বলেছেন। এই নদী নিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে লেখা হবে। পাশাপাশি নদীকে কীভাবে বাঁচিয়ে তোলা যায়, তা নিয়েও পরিকল্পনা করা হবে। উল্লেখ্য, নদীর চর মানুষের জীবন ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করছে। যার ফলে নতুন চর জন্মেছে বিভিন্ন জায়গায়। উল্টো দিকে ভাঙনের ফলে বহু জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু নিয়মানুযায়ী চরের জমিকে খাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই জমিতে চাষ করতে পারেন না চাষিরা। যেমন, নদীয়া জেলার চাপড়া ব্লকের মহৎপুর এলাকায় জলঙ্গি নদী গতিপথ পরিবর্তন করেছে। চরের খাস জমি ও রায়তি জমি নিয়ে গ্রাম্য দ্বন্দ্বের জেরে প্রায় ১২০০ বিঘা জমিতে চাষ বন্ধ হয়ে রয়েছে।