তন্ময় মল্লিক: তুলনা করাটা মানুষের একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। দীঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনের আগেই সেটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। মূল তুলনাটা পুরীর সঙ্গে দীঘার মন্দিরের। একেবারে নিখুঁত নির্মাণ। তা দেখে অনেকে বলছেন, এবার পুরীকে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে হবে, ‘আমাদের কোনও শাখা নেই।’ দীঘার জগন্নাথধাম নির্মাণে পদে পদে বাধা পেয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু, দমে যাননি। দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর মন্দির নির্মাণের সময়েও এমনই বাধা পেয়েছিলেন রানি রাসমণি। এনিয়েও দক্ষিণেশ্বরের সঙ্গে দীঘার জগন্নাথ মন্দিরের যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। তবে তুলনা, বিতর্ক পাশে রেখে একটা কথা বলাই যায়, বাংলার রাজনীতিতে মেরুকরণের যে আগুন বিজেপি জেনেছিল, জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করে তাতে জল ঢেলে দিলেন মমতা। ফের বুঝিয়ে দিলেন, গোলপোস্টের নীচে তিনি দাঁড়ালে নেটে বল জড়ানোর হিম্মত কারও নেই।
মন্দির বানিয়ে ভোট পাওয়া যায় না। সেটা চব্বিশের ভোটেই প্রমাণ হয়েছে। বিজেপি ভেবেছিল, রামমন্দির বানিয়েই লোকসভা ভোটে কিস্তিমাত করবে। নরেন্দ্র মোদির হ্যাটট্রিক তো হবেই, পূরণ হবে চারশো আসন পারের খোয়াব। কিন্তু বিধি বাম। যেখানে রামমন্দির নির্মাণ হয়েছে সেই লোকসভা আসনেই হেরেছে বিজেপি। এমনকী, বিজেপির দুর্গ বলে পরিচিত বারাণসী আসনে রামমন্দিরের উদ্বোধক নরেন্দ্র মোদির জয়ের মার্জিন প্রায় ৬৮ শতাংশ কমেছে। এ-থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, ধর্মীয় উন্মাদনার জিগিরে মানুষের মধ্যে আবেগ সৃষ্টি হয়, কিন্তু ইভিএমে তার প্রভাব তেমন পড়ে না।
তাই দীঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরি করায় তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনে ফায়দা পাবে, এমনটা ভাবার অবকাশ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেটা খুব ভালোই জানেন। তাই তিনি দীঘায় জগন্নাথধাম উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে গিয়ে হিন্দু-হিন্দু করেননি। তাঁর কথায়, ‘ধর্ম হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। মানুষের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস, ভালোবাসা রাখাই তো ধর্ম।’
মুখ্যমন্ত্রীর দীঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরির ঘোষণার সময় থেকেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারি টাকায় কেন নির্মিত হচ্ছে মন্দির, এই প্রশ্ন বিরোধীদের। জগন্নাথদেবের একটা মন্দির থাকতে কেন আরও একটা মন্দির? এই জাতীয় বিতর্ক তো আছেই, পাশাপাশি আছে মন্দির নির্মাণের অভিপ্রায়ের কারণ নিয়েও। অনেকেই বলেন, ২০১৭ সালে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের কিছু সেবাইত বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে ভিতরে ঢুকতে দেবেন না বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। তখনই নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন।
এটা সত্যি নাকি সবটাই মিডিয়ার প্রচার, সেটা একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই বলতে পারবেন। তবে এটা বাস্তব হলে তৃণমূল সুপ্রিমো সম্পর্কে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের প্রচারের ধরনও বদলে যাবে। এতদিন তাঁরা বলতেন, মমতা যা বলেন, তা করেন। এবার থেকে তাঁরা বলবেন, নেত্রী যা ভাবেন, সেটাও করেন।
প্রথমে বাংলাদেশ, তারপর কাশ্মীরে জঙ্গিহানা। পরপর এই দু’টি ঘটনাকে সামনে রেখে বিজেপি বাংলায় মেরুকরণের রাজনীতির ভিতকে পাকা করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার হয়েছে। তাকে সামনে রেখে এরাজ্যে মুসলিম বিরোধী একটা আবহ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। তাতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে সাময়িক কিছুটা প্রভাবও পড়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ কিছুটা স্বাভাবিক হতেই বিদ্বেষ অনেকটা প্রশমিত। তারই মধ্যে ঘটল পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা। কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ মানুষের সুরক্ষা দিতে পারেনি। সেই ব্যর্থতা স্বীকার করে ক্ষমা না চেয়ে পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফের ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষ ছড়াচ্ছে। বিজেপি ধর্মের মায়াজাল সৃষ্টি করে মানুষের সত্যি-মিথ্যে যাচাইয়ের শক্তি কেড়ে নিতে চাইছে। হিন্দু মানেই বিজেপি, এমন একটা ধারণা মনে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ঠিক এই সময়েই দীঘায় জগন্নাথদেবের মন্দির উদ্বোধন করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ধর্ম কোনও দলের নয়। সব ধর্মের প্রতি যিনি শ্রদ্ধাশীল তিনিই প্রকৃত ধার্মিক।
প্রশাসনিক প্রধান হবেন ধর্ম নিরপেক্ষ, সেটাই সেক্যুলার সিস্টেমের প্রাথমিক শর্ত। ধর্মকে অস্বীকার নয়, সমস্ত ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল হওয়ার নামই ধর্ম নিরপেক্ষতা। সেটা করার জন্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বারবার উঠেছে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ।
বঙ্গ বিজেপি মনে করে, মুখ্যমন্ত্রীকে সংখ্যালঘুদের ‘ত্রাতা’ প্রমাণ করতে পারলেই সব হিন্দুভোট তারা পাবে। সেই লক্ষ্যে বিজেপির অনেকে তৃণমূল নেত্রীকে কদর্য ভাষায় আক্রমণও করেন। জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পর সেটা করতে গেলে বঙ্গ বিজেপির লাভের চেয়ে ক্ষতিই হবে বেশি। কারণ ‘জগতের নাথ’কে বাংলার বুকে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। তবে, জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে বঙ্গ বিজেপিকে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় ফেলেছেন দিলীপ ঘোষ।
দীঘার জগন্নাথ মন্দিরে না যাওয়ার দলীয় সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। তারপরেও বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দীঘায় গিয়ে বলেছেন, ভগবান মুখ্যমন্ত্রীকে যোগ্য মনে করেছেন বলেই তাঁকে দিয়ে মন্দির নির্মাণের কাজ করিয়ে নিয়েছেন। তা নিয়ে বঙ্গ বিজেপিতে তোলপাড় হচ্ছে। কারণ বঙ্গ বিজেপি এতদিন যাঁকে সংখ্যালঘু তোষণকারী প্রমাণে আদাজল খেয়ে লড়াই করেছে, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই শেষপর্যন্ত ‘ভগবানের প্রতিনিধি’!
বছর ঘুরলেই বাংলার বিধানসভা নির্বাচন। বঙ্গ বিজেপি বুঝে গিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামাজিক প্রকল্পের সঙ্গে লড়াই করে নির্বাচনে জেতা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই হিন্দুভোট এককাট্টা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের নিহত দুই হিন্দু পরিবারকে অর্থ সাহায্য করে এসেছে। হিন্দুভোটকে পাখির চোখ করে যখন বঙ্গ বিজেপি ঘুঁটি সাজাচ্ছিল, ঠিক তখনই জগন্নাথদেবের মন্দিরের শ্রীচক্রের মাথায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উড়িয়ে দিলেন পবিত্র ধ্বজা। এই মন্দির উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে বঙ্গ বিজেপির কোন্দল চরমে উঠেছে। তার মেরামতির কোনও রাস্তা গেরুয়া শিবির খুঁজে পাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে নজর ঘোরাতে প্রধানমন্ত্রীকে ময়দানে নামাতে বাধ্য হয়েছে বিজেপি। কলকাতার বড়বাজারে অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর আগেও বাংলার বুকে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। বন্যায়, ঝড়ে বহু মানুষের জীবনহানি হয়েছে। কিন্তু তার জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা তো দূরের কথা, নানাভাবে বাংলার ন্যায্য প্রাপ্য আটকে রাখার ফিকির খুঁজেছে। চার বছর হল বাংলার ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আবাস যোজনার টাকাও দেয়নি। এহেন বিজেপির দিল্লির সরকারের প্রধান একপ্রকার উপযাচক হয়েই ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন।
অনেকেই বলছেন, জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন ছাব্বিশের নির্বাচনের জন্য হতে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাস্টারস্ট্রোক। হিন্দুভোটের উপর একাধিপত্য কায়েমের জন্য বিজেপি যে ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছিল, তা এই মন্দির উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে ভেস্তে গিয়েছে। বিজেপি নেতারাও সেটা ভালোই বুঝতে পারছেন। তাই হিন্দুত্বের কার্ড খেলে বাজিমাত করতে চাওয়া বিজেপি চরম বিপাকে পড়েছে। সেই কারণেই বড়বাজারে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
দীঘার জগন্নাথ মন্দির শুধু বাংলার নয়, ওড়িশারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ পুরীতে সারা বছর যত পর্যটক যান তার সিংহভাগই বাংলার। দীঘা তাদের ভিড়ে থাবা বসাবে। তাতে পুরীর অর্থনীতি ব্যাপকভাবে মার খাবে। তার উপর দীঘার মন্দিরের পুজোপাঠের দায়িত্ব ইসকন কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে এখানে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড় বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীঘায় জগন্নাথদেবের মন্দির প্রতিষ্ঠা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু হিন্দুদের হৃদয় জয় করলেন না, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ব্যবসায়ীদেরও কাছে টেনে নিলেন বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
রাজনীতি শুধু সম্ভাবনার শিল্প নয়, চরম অনিশ্চয়তারও। খেলার ফয়সালার জন্য ক্রিকেটের শেষ বলটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এক সময় যাঁদের মুখে ছিল শুধুই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি, তাঁদের মুখেই শোনা যাচ্ছে ‘জয় জগন্নাথ’। তাতে বেজায় খুশি তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা। তাঁরা মনে করছেন, প্রভু জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামদেবের ছবি নেই এমন হিন্দু পরিবার বাংলায় পাওয়া যাবে না। ছবি থাকলেও বাঙালির মুখে ‘জয় জগন্নাথ’ তেমন শোনা যেত না। বাংলার মাটিতে প্রভু পা রাখায় এবার সেটাই হতে চলেছে। ‘জয় শ্রীরাম’কে টেক্কা দেবে ‘জয় জগন্নাথ’। কারণ জয় শ্রীরাম বিজেপির আমদানি করা ‘রাজনৈতিক স্লোগান’। আর বাঙালির অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উচ্চারিত হয় ‘জয় জগন্নাথ’।