অর্ক দে, কলকাতা: সাধারণত প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ‘এলাকা’ নির্দিষ্ট করা থাকে। যাঁর যাঁর এলাকায় তিনিই সর্বেসর্বা। একইভাবে মশারাও কি এবার এলাকা ভাগাভাগি করে নিল! আপাতভাবে হেঁয়ালি মনে হলেও বাস্তবে কার্যত এটাই ঘটছে। উত্তর কলকাতায় যখন ‘রাজত্ব’ করছে ম্যালেরিয়ার বাহক ‘অ্যানোফিলিস স্টিফেনসাই’, শহরের দক্ষিণে তখন ডেঙ্গু বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’ মশার দাপাদাপি। শহরে মশাবাহিত রোগ-বিস্তারের ক্ষেত্রে দুই ধরনের মশার অদ্ভুত সমীকরণ স্পষ্ট হয়েছে কলকাতা পুরসভার তথ্য থেকেই। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, উত্তর কলকাতায় ম্যালেরিয়া আর দক্ষিণে ডেঙ্গু সংক্রমণের বাড়বাড়ন্ত। শহরে যত জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন, তার ৮৬ শতাংশই উত্তর কলকাতার। অর্থাৎ ১ থেকে ৮ নম্বর বরো এলাকার। মাত্র ১৪ শতাংশ আসছে দক্ষিণ কলকাতা অর্থাৎ ৯ থেকে ১৬ নম্বর বরো থেকে। আবার, শহরের মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের ৬৮ শতাংশই দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন এলাকার। পুরসভার স্বাস্থ্যবিভাগ জানাচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরে এটাই ‘ট্রেন্ড’।
কিন্তু কেন এই বৈপরীত্য? পুরসভার মুখ্য পতঙ্গবিদ দেবাশিস বিশ্বাস বলেন, ‘উত্তর কলকাতায় ম্যালেরিয়া বেশি হওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। আমরা সমীক্ষা চালিয়ে ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু কারণ নির্দিষ্ট করেছি। যেমন, ভিন রাজ্য সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রচুর শ্রমিক আসেন উত্তর কলকাতায়। শ্যামবাজার, টালা, মানিকতলা, হাতিবাগান, শিয়ালদহ, কোলে মার্কেট, বউবাজার, বড়বাজার, পোস্তা সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিকের আনাগোনা বেশি। ফুটপাতেই রাত কাটান বহু মানুষ। তাঁদের মধ্যে কেউ ম্যালেরিয়া সংক্রামিত হলে মশার মাধ্যমে সহজেই তা ছড়িয়ে পড়ে। সেই তুলনায় দক্ষিণ কলকাতায় ফুটপাতবাসী হোক বা পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যাটা অনেকটাই কম।’
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দেবাশিসবাবু আরও বলেন, ‘উত্তর কলকাতা শহরের সবচেয়ে পুরোনো এলাকা। সেখানে নতুন নির্মাণকাজের সংখ্যা তুলনামূলক কম। খালি জমির সংখ্যাও হাতেগোনা। গবেষণা বলছে, খালি জমি যেখানে বেশি থাকবে, সেখানে প্লাস্টিক থেকে থার্মোকল, ছোটো কন্টেনার, ডাবের খোল, মাটির ভাঁড় ইত্যাদি জমবে। এগুলির মধ্যে সামান্য জল জমে থাকলেও ডেঙ্গুবাহক মশার বংশবিস্তার সহজে হবে। কিন্তু ওই স্বল্প জমা জলে ম্যালেরিয়া বাহক মশা খুব একটা বাড়ে না। ম্যালেরিয়ার মশা খোলা আকাশের নীচে তুলনামূলক বড় জায়গায় বংশবৃদ্ধি করে। দক্ষিণ কলকাতায় বহুতল আবাসন তৈরির কাজ উত্তরের তুলনায় বেশি। খালি জমিও প্রচুর। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন জায়গায় বাড়ির ছাদে টবে বা কনস্ট্রাকশন সাইটে ঘুপচির মধ্যে বা খালি জমিতে অল্প জলেও ডেঙ্গুর মশা বাড়ছে।’ দুই মশার বংশবৃদ্ধির এই চরিত্রগত ফারাকের জন্যই রোগ-বিস্তারের এমন সমীকরণ বলে জানান তিনি।