ব্রতীন দাস, মালবাজার: সকাল ৭টা। সাইরেন বেজেছে। কাজের ঘণ্টা শুনে রাঙামাটি চা বাগানের ফ্যাক্টরি লাইনে জড়ো হয়েছেন সালমা লোহার, পুষ্পা ওরাওঁ, মিনতি মুন্ডা। পাতা তোলার কাজে যোগ দেওয়ার আগে নিজেদের সুখ-দুঃখ একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন তাঁরা।
ব্রতীন দাস, মালবাজার: সকাল ৭টা। সাইরেন বেজেছে। কাজের ঘণ্টা শুনে রাঙামাটি চা বাগানের ফ্যাক্টরি লাইনে জড়ো হয়েছেন সালমা লোহার, পুষ্পা ওরাওঁ, মিনতি মুন্ডা। পাতা তোলার কাজে যোগ দেওয়ার আগে নিজেদের সুখ-দুঃখ একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন তাঁরা।
বাগানের সুন্দরী লাইনেও বেশ ভিড়। প্রচারে বেরবেন ‘ঘরের ছেলে’। সারাদিন কোথায় কী খাওয়া জুটবে, আদৌও খাওয়া হবে কি না, সেজন্য ভোরে উঠে রান্না করে টিফিন কৌটোয় তাঁর জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন কয়েকজন চা শ্রমিক।
হালকা রঙের ফুল শার্ট আর ফরম্যাল প্যান্টে লেবার কোয়ার্টার থেকে বাগানের ‘প্রাক্তন’ শ্রমিক বুলুচিক বরাইক বেরতেই তাঁর হাতে টিফিন কৌটো তুলে দিয়ে নুরি তামাং বললেন, ‘ভাইয়া, সময় করে খেয়ে নিও।’
শ্রমিকদের এই ভালোবাসায় আপ্লুত রাজ্যের আদিবাসী ও অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের বিদায়ী মন্ত্রী তথা মাল বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী বুলুচিক। বললেন, সারাবছর ওঁরা এভাবেই খেয়াল রাখে আমার। ওঁদের আপদে-বিপদেও সবার আগে ছুটে যাই আমি। শুধু রাঙামাটি নয়, আমার বিধানসভায় ২৯টি চা বাগান। সর্বত্রই আমার অবাধ বিচরণ। প্রতিটি বাগান হাতের তালুর মতো চিনি।
রাঙামাটি হোক কিংবা সাইলি, মিনগ্লাস চা বাগান, সর্বত্রই পতপত করে উড়ছে ঘাসের উপর জোড়াফুলের ঝান্ডা। মাল বিধানসভায় এবার ভোটের হাওয়া কেমন? পাড়ার মোড়ে চায়ের ঠেক থেকে চা শ্রমিক মহল্লায় কানাঘুঁষো, এবারের লড়াই ‘ঘরের ছেলে’ বনাম ‘বহিরাগত’র। বুলুচিকের মূল প্রতিপক্ষ যিনি, বিজেপি প্রার্থী সুকরা মুন্ডার বাড়ি নাগরাকাটায়। সেখান থেকে নিয়ে এসে মালবাজারে প্রার্থী করাতেই তাঁর গায়ে সেঁটে গিয়েছে ‘বহিরাগত’ তকমা। যা ভোট ময়দানে কিছুটা হলেও যে তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়েছে, তা মানছেন সুকরা। যদিও পদ্ম প্রার্থীর দাবি, নাগরাকাটায় বাড়ি হলেও মালবাজারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আর আমিও চা শ্রমিকদের ‘কাছের মানুষ।’ কারণ আমার বাড়ি গাঠিয়া চা বাগানে।
এসআইআরে মাল বিধানসভায় প্রায় ২১ হাজার ভোটারের নাম বিচারাধীনের আওতায় পড়ে। বেশিরভাগই আদিবাসী ও সংখ্যালঘু। সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় তাঁদের অনেকে বাদ পড়েছেন। অনেকে আবার ট্রাইবুনালে আবেদন করছেন। কিন্তু বিচারাধীনের তালিকায় থাকা সবার নাম যদি বাদও যায়, তারপরও জোড়াফুলের দখলে থাকবে মাল বিধানসভা। হিসাব কষে বলছেন তৃণমূল কর্মীরা। জয় নিয়ে প্রত্যয়ী বুলুচিকের কথায়, একুশের নির্বাচনে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছি। চব্বিশের লোকসভায় সেই লিড বেড়ে ১২ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এবার ব্যবধান আরও বাড়বে। তাঁর দাবি, গত পাঁচ বছরে আমার বিধানসভায় ২৫০ কোটি টাকার বেশি কাজ হয়েছে। চা বাগানে পানীয় জল, রাস্তা, পথবাতি, নিকাশি নালা, কালভার্ট, কমিউনিটি হল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স, ক্রেশ, স্কুলবাস কী হয়নি। বিজেপি শাসিত অসমে আদিবাসীরা অত্যাচারিত হচ্ছেন। লাঞ্ছিত হচ্ছেন। আমাদের এখানে সসম্মানে রয়েছেন আদিবাসীরা। জয় জোহার, তফসিলি বন্ধু পেনশন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, বাংলার বাড়ি সব মিলছে।
১২টি অঞ্চল ও মাল পুরসভা নিয়ে বিধানসভা নির্বাচনি ক্ষেত্র। বারোটির মধ্যে ওদলাবাড়ি ও বাগরাকোট পঞ্চায়েতে কিছুটা ব্যাকফুটে তৃণমূল। মাল পুরসভাতেও খানিকটা ধাক্কা খেতে হতে পারে জোড়াফুলকে। সেটা মাথায় রেখেই বাকি ১০টি অঞ্চল থেকে ব্যবধান বাড়িয়ে শহরে ভোটের ঘাটতি মেটাতে এখন গ্রামে চষে বেড়াচ্ছেন বুলুচিক। অন্যদিকে, ‘দলবদলু’ প্রার্থী সুকরাকে নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ কিছুটা থিতু হলেও পদ্ম শিবিরের কর্মীরা এখনও তেড়েফুঁড়ে নামতে পারেননি ময়দানে। বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য মহেশ বাগে বলেন, সময় কম। প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দিতে তাঁকে নিয়ে আমরা ঘুরছি। তবে পদ্মফুলের প্রতীক দেখে ভোট হবে।