Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হিসেব কষে বাহানা!

প্রথমে হাইকোর্ট, তারপর সুপ্রিম কোর্ট, আবার হাইকোর্ট—এ রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ শুরু করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে বারবার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সর্বশেষ নির্দেশটি এসেছিল ৭ নভেম্বর।

হিসেব কষে বাহানা!
  • ২২ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রথমে হাইকোর্ট, তারপর সুপ্রিম কোর্ট, আবার হাইকোর্ট—এ রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ শুরু করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে বারবার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সর্বশেষ নির্দেশটি এসেছিল ৭ নভেম্বর। তারপর দু’সপ্তাহ অতিক্রান্ত। আদালতের নির্দেশ মানা তো দূরের কথা, বরং নতুন বাহানা তৈরি করে রাজ্যের উপর পালটা চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে মোদি সরকার। ফলে একদিকে যেমন আদালত অবমাননার প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে কেন্দ্র কাজ চালু করার সবুজ সংকেত দেবে কি না, বাংলার শ্রমিকদের বকেয়া মজুরির টাকা মেটাবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। অনেকে মনে করছেন, চলতি অর্থবর্ষে (২০২৫-২৬) কেন্দ্রীয় বাজেটে পশ্চিমবঙ্গের ১০০ দিনের কাজের জন্য কোনও অর্থ বরাদ্দ করাই হয়নি। এখন মাঝপথে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ করে সেই সমস্যা সমাধানে হয়তো আদৌ আগ্রহী নয় কেন্দ্র। কিন্তু সেই পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে না জানিয়ে এখন নানা অছিলা তৈরি করা হচ্ছে। আগামী বছরের এপ্রিলে রাজ্য বিধানসভার ভোট হতে পারে। তার আগে ফেব্রুয়ারি মাসে পরের আর্থিক বছরের বাজেটে পশ্চিমবঙ্গের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে বন্ধ থাকা প্রকল্প ফের চালুর নির্দেশ দিতে পারে কেন্দ্র। এর অর্থ, আদালত যাই নির্দেশ দিক, এখনই রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ শুরুর সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

Advertisement

১০০ দিনের কাজে মূলত চারটি জেলায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ২০২১ সালে টাকা আটকে রেখে গোটা রাজ্যে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেয় কেন্দ্র। তারা একাধিকবার রাজ্যে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে অভিযোগ খতিয়ে দেখে তা শুধরে নেওয়ার জন্য রাজ্যকে পরামর্শ দেয়। নবান্ন সেইমতো ব্যবস্থাও নেয়। কিন্তু তারপরেও সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাজ্যকে বিপাকে ফেলতে ফের প্রকল্প চালু করতে অস্বীকার করে দিল্লি। এর বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়। আদালত ১ আগস্ট থেকে কাজ চালু করার নির্দেশ দেয়। আদালতের যুক্তি ছিল, দুর্নীতি রুখতে রাজ্য সরকারকে যে কোনও শর্ত দিতে পারে কেন্দ্র। কিন্তু গোটা রাজ্যে কাজ আটকে রাখা যাবে না। আদালত প্রশ্ন তোলে, দুই সরকারের বিরোধে কেন সাধারণ মানুষ ফল ভুগবে? আদালত এও জানায়, প্রয়োজনে ওই চার জেলাকে বাদ দিয়ে রাজ্যের বাকি অংশে এই কাজ চালু করতে হবে। জনস্বার্থে এই কাজ চালু হওয়া দরকার। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় কেন্দ্র। কিন্তু শীর্ষ আদালত কার্যত তাতে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে কেন্দ্রের মামলা খারিজ করে দেয় গত মাসের শেষের দিকে। অগত্যা মামলাটি ফিরে আসে হাইকোর্টে। রাজ্যের আদালত কোনও সময় নষ্ট না করে দ্রুত ১০০ দিনের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তাতে মান্যতা দিচ্ছে কই কেন্দ্রের মোদি সরকার?
কারণ, এর পরেও টালবাহানা অব্যাহত! এবারের নতুন কৌশল— কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকে জমা দিতে হবে ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট’ বা এটিআর। কারণ ১০০ দিনের কাজে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নাকি ‘সন্তোষজনক নয়’। গত ১১ নভেম্বর রাজ্যকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বচ্ছতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের প্রমাণ নাকি মেলেনি রাজ্যের ১৯ জেলায়। অথচ রাজ্যের দাবি হল, চিঠিতে তোলা প্রতিটি অভিযোগ ভিত্তিহীন। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসাবে এ পর্যন্ত ২৫টি এটিআর জমা দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির ৬ কোটি টাকা উদ্ধার করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এসবের প্রমাণও আছে। তারপরেও নতুন করে এটিআর চাওয়ার অর্থ যে আসলে ‘রাজনৈতিক’, তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তাছাড়াও প্রশ্ন হল, এটিআর ‘সন্তোষজনক’ না মনে হলে তা নিয়ে কেন্দ্র রাজ্য দুই সরকারের মধ্যে আলাপ আলোচনা, চিঠি দেওয়া-নেওয়া চলতেই পারে। কিন্তু সেই ‘অজুহাতে’ কাজ বন্ধ রাখার অর্থ হল আদালত যে যুক্তিতে কাজ চালু করার নির্দেশ দিয়েছে, তাকে অসম্মান ও অবমাননা করা। শোনা যাচ্ছে, কেন্দ্রের এই নতুন টালবাহানার বিরুদ্ধে ফের আদালতে মামলা হতে পারে। তেমনটা হওয়াও হয়তো উচিত। কারণ, বাংলার প্রায় ২.৭ কোটি ১০০ দিনের কর্মী রয়েছেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে কাজ বন্ধের ফলে গ্রামাঞ্চলে শ্রমদিবস কমে হয়েছে ৭০ শতাংশ। পাশাপাশি রাজ্যের প্রাপ্য প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র। যদিও রাজ্য সরকার তার নিজস্ব তহবিল থেকে ১০০ দিনের প্রকল্প চালু রেখেছে জনস্বার্থে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলতে পারে! কেন্দ্র যে আদালতের কথা মানতে নারাজ তা তাদের টালবাহানাতেই স্পষ্ট। কেন্দ্রের এমন ভূমিকা যথেষ্ট আশঙ্কার বিষয় হলেও এমন একদিন আসবে যেদিন বন্ধ প্রকল্পটি কেন্দ্রকে চালু করতেই হবে। কারণ আগামী বছরেই আছে পশ্চিমবঙ্গের ভোট। আর ভোট বড়ো বালাই। সেখানে জনতা জনার্দন রায় দেবেন। রাজ্যের গরিব মানুষই তখন বুঝে নেবেন কে তাঁদের পাশে আছে, আর কে স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁদের ভাতে মারার কৌশল করছে। তাই আপাতত অপেক্ষা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ