Bartaman Logo
২ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

সংস্কারের নামে তছনছ মহাত্মার ঘর! বেলেঘাটার ঐতিহাসিক গান্ধী ভবনের ভগ্নদশা, উই ধরেছে! খস পড়ছে চাঙড়, ছাদ থেকে জল

রাস্তায় দাঁড়িয়ে দলে দলে মানুষ দাঙ্গা থামানোর প্রতিকার চেয়ে হইহল্লা শুরু করেছেন। গান্ধীজি দু’কানে আঙুল দিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে, চিৎকার থামার অপেক্ষায়।

সংস্কারের নামে তছনছ মহাত্মার ঘর! বেলেঘাটার ঐতিহাসিক গান্ধী ভবনের ভগ্নদশা, উই ধরেছে! খস পড়ছে চাঙড়, ছাদ থেকে জল
  • ২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাস্তায় দাঁড়িয়ে দলে দলে মানুষ দাঙ্গা থামানোর প্রতিকার চেয়ে হইহল্লা শুরু করেছেন। গান্ধীজি দু’কানে আঙুল দিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে, চিৎকার থামার অপেক্ষায়। ঐতিহাসিক সে বারান্দাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এমনভাবে যেটি আর কেউ কোনোদিন দেখার সুযোগ পাবেন না।

Advertisement

সুরাবর্দি সহ তখনকার নামকরা হিন্দু ও মুসলমান নেতারা যে ঘরে বসে গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সে ঘর ভেঙে তছনছ করা হয়েছে। ঘরে দু’টি দরজার মাঝে গান্ধী বসে। খুঁজলে এখনও সে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি দেখতে পাওয়া যায়। সে দরজা দু’টি ভেঙে, গুঁড়িয়ে দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ঘরে হলুদ রং। কয়েকটি চেয়ার পাতা। ১৫ আগস্ট রাজা গোপালাচারি, নবগঠিত মন্ত্রিসভার সদস্যরা এই বাড়িতে উপস্থিত। অন্যান্য দলের নেতৃত্বও বাড়িতে অহরহ যাতায়াত করছেন গান্ধীর দেখা পেতে। ভারতের ইতিহাসে এ বাড়ি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সে ইতিহাস স্রেফ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
অর্থাৎ গান্ধী যে বাড়িতে থাকছেন, অনশন করছেন দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতায় শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে, সংস্কারের নামে সর্বনাশ করা হয়েছে সে বাড়ির! ভোল তো পালটে দেওয়াই হয়েছে তার উপর সংস্কারের কয়েক বছরের মধ্যে দেওয়াল থেকে খসে পড়তে শুরু করেছে চাঙড়। উই ধরেছে একাধিক জায়গায়। ছাদ ভেঙে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির জল। ‘এই অদূরদর্শী, অপরিণামদর্শী, পরিকল্পনাহীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের দায় বর্তায় রাজ্যের পূর্বতন সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উপর,’ সরাসরি এই অভিযোগ করেছে পূর্ব কলিকাতা গান্ধী স্মারক সমিতি।
সমিতির সম্পাদক পাপড়ি সরকার বলেছেন, ‘২০১৮ সালে নবান্নে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে। আমরা সংস্কার কাজের পরিকল্পনার খসড়া দিয়েছিলাম। তথ্য সংস্কৃতি বিভাগ কাজ শুরু করেছিল। তারপর দেখলাম, সব কিছু নষ্ট করে ফেলা হল। গান্ধীজির ঘর বিকৃত করা হল। ভাঙা হল। বহুমূল্য ছবি নষ্ট করে ফেলা হল। ক্যাটকেটে হলুদ রং করে সম্পূর্ণ পালটে ফেলা হল এই অমূল্য স্মৃতিঘর। আমরা অসহায় হয়ে দাঁ঩ড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।’
বেলেঘাটার এই বাড়িটির নাম ‘হায়দরি মঞ্জিল’। এখানে গান্ধী ছিলেন ১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর। সে সময় কলকাতা সাম্প্রদায়িক হিংসার আগুনে দাউদাউ জ্বলছে। দাঙ্গা থামাতে ১ সেপ্টেম্বর গান্ধী অনশন শুরু করেন। ৪ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা তাঁর কাছে এসে অস্ত্র সমর্পণ ও শান্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তিনি ভঙ্গ করেন অনশন। এই ঘটনা পরবর্তীকালে ‘মিরাকল অব ক্যালকাটা’ আখ্যা পায়। ঢুকে যায় ইতিহাসে। 
১৯৪৭ সালের ৯ই আগস্ট গান্ধীজি বিহার থেকে সোদপুর আশ্রমে পৌঁছন। ঠিক করেছিলেন নোয়াখালি যাবেন। তবে সুরাবর্দি সহ অন্যান্য কংগ্রেস নেতারা তাঁকে কলকাতায় থাকতে অনুরোধ করে বলেন, গান্ধীজি কলকাতায় বসে দাঙ্গা নিবারণ করুন। তাহলে এ খবর সারা ভারতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। গান্ধীর শর্ত ছিল, তিনি দাঙ্গা কবলিত ও হিন্দু অধ্যুষিত কোনো অঞ্চলে একটি মুসললমান বাড়িতে থাকবেন। এবং সুরাবর্দিকে তাঁর সঙ্গে থাকতে হবে। তারপর বেলেঘাটার হায়দরি মঞ্জিল খুঁজে বের করে গান্ধীর থাকার ব্যবস্থা হয়। 
ভারতের এ হেন মূল্যবান ইতিহাসের সাক্ষী ও ঐতিহাসিক সম্পদটির মূল গঠন ধ্বংস করে প্রায় সর্বনাশই ঘটিয়ে ফেলা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের। তা ভারতের ইতিহাসের প্রতি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা। সর্বত্র প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই ইতিহাসকে সম্মান করি? নাকি ইতিহাসকে ব্যবহার করি স্রেফ বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। গান্ধী ভবন সেই প্রশ্নটাই আবারও তুলে দিয়েছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ