শুভজিৎ অধিকারী: ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে/ বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর ধরণীর বহিরাকাশে/ অন্তরিত মেঘমালা/ প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত/ জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা...।’
শুভজিৎ অধিকারী: ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে/ বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর ধরণীর বহিরাকাশে/ অন্তরিত মেঘমালা/ প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত/ জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা...।’
—মহালয়ার কাকভোরে এই কয়েকটা কথার ঠাটবুননে কী এমন সম্মোহিনী ক্ষমতা রয়েছে যে, গোটা বিশ্বের বাঙালিকে মুহূর্তেই এক ছাতার তলায় এনে দেয়? বছরের পর বছর নতুন করে জোড়া লাগিয়ে চলে একটা জাতির অস্মিতাকে? বাঙালির শিরা-উপশিরায় জেগে ওঠে অদ্ভুত এক শিহরন। মনের কোণে ভেসে ভেসে ওঠে কাল্পনিক একটা রণাঙ্গনের স্পষ্ট ছবি। যেখানে ঘটতে চলেছে ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধ। ধরণীর বহিরাকাশে অস্ত্রের ঝনঝনানি। অশুভ শক্তির বিনাশে নারীশক্তির হুঙ্কার। দুন্দুভি বেজে উঠল পিতৃপক্ষ শেষের ভোরে। টানটান উত্তেজনা। যুদ্ধ শুরু ষষ্ঠীতে। বিজয়া-দশমীতে শেষ। দেবরাজ ইন্দ্রের দেওয়া বজ্রাস্ত্রে ধরাশায়ী মহিষাসুর। তিরে-ত্রিশূলে বিদ্ধ বক্ষস্থল। মহিষাসুরের দিকে কর্কশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক দামাল মেয়ে। মুখে অট্টহাসি! এই যে কল্পিত একটা যুদ্ধ, সেটা কিন্তু শরৎকালের প্রেক্ষাপটে ছিল না। যুদ্ধটা ছিল আসলে রাম-রাবণের। যাকে বলে ‘অকালবোধন’। অথচ, সেই যুদ্ধ যে কীভাবে বাঙালির হৃদয়ে দুর্গার মহিষাসুর বিজয়ের গল্পগাথা হয়ে চিরতরে বিঁধে গেল, তা বড় আশ্চর্যের! কখনও আম-বাঙালি সচেতনভাবে ভাবার চেষ্টা করেনি যে, দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের সঙ্গে মূল পুরাণের সরাসরি যোগ নেই। বরং মহাকাব্যের একটা রোমহর্ষক যুদ্ধের বর্ণনা স্রেফ কানে শুনেই বাঙালি বুঁদ। দুর্গা আমাদের ঘরের মেয়ে। সে দামিনীর মতো ছেলেপুলে নিয়ে বাপের বাড়ি আসে, বছরে একবার। অন্য আর পাঁচজন বাঙালি মেয়ের মতো। সব অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে আবারও সে স্বামীর ঘরে ফিরে যায়।
আচ্ছা ধরা যাক, কোনও একটা বছর মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ ইথারে ভেসে এল না! বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীস্তোত্র শোনা হল না। তা হলে ওই বছর বাঙালির দুর্গোৎসব কেমন কাটবে? ভাবলে শিউরে উঠতে হয়! নতুবা বাঙালিকে আবারও ফিরে যেতে হয় ১৯৩২ সালের পূর্বে। তখন বাঙালির দুর্গাপুজো বলতে ছিল বাসন্তীর আরাধনা। ঋতুরাজ বসন্তে তার পুজো। রাজ-রাজড়াদের ঘরের মেয়ে। আজকের মতো সাধারণ বাঙালির ঘরের মেয়ে হয়ে ওঠেনি তখনও। তাকে ঘিরে কতই না মিথ, কতই না কিংবদন্তি। নৃপতি তনয়াকে পথে-প্রান্তরে, প্যান্ডেলে বসিয়ে পুজো করা! সে তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! মঙ্গল প্রার্থনা করতে গিয়ে অমঙ্গলের ভার নেওয়া—নৈব নৈব চ। আসলে, তখন রাজ-বৈভব আর উমার আরাধনা ছিল সমার্থক। কিন্তু রাজকন্যা কি আর জানতেন, ওই বছরই তাঁর শিকল মুক্তিতে গোকুলে প্ল্যান সেরে ফেলেছেন পরম এক ব্রাহ্মণের সন্তান? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। বেতার-বাঙালির কাছে যিনি সমধিক পরিচিত বাণীকুমার নামে। গোকুলে তাঁর অন্যতম তিন সহযোগী হরিশ্চন্দ্র বালি, পঙ্কজ মল্লিক ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।
ওই বছরের চৈত্রমাস। পিঠোপিঠি পড়েছিল বাসন্তীপুজো আর অন্নপূর্ণা পুজো। দু’টো পুজোর মাঝের সময়টাকে মাহেন্দ্রক্ষণ ধরে ঠিক হল, বেতারে একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হবে। সেটি শ্রীশ্রী মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর উপর ভিত্তি করে মহামায়ার মহিমাগাথা একটি গীতি আলেখ্য। অনুষ্ঠানটির নামকরণও করলেন বাণীকুমার নিজেই—‘বসন্তেশ্বরী’। ওই বছর বাসন্তীপুজোর শুক্লা অষ্টমীর ভোরে বিশেষ প্রভাতী অধিবেশনে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হল। আকাশবাণীর ‘গল্পদাদুর’ আসরের শিরোমণি মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানতে পারি, ‘বসন্তেশ্বরী’র সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল। সহযোগী ছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক ও হরিশ্চন্দ্র বালি। নাট্যকথা সূত্র ও কাব্য পাঠ করেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আর শ্লোক ও চণ্ডীপাঠ করেন স্বয়ং বাণীকুমার। বাঙালি তাতে সাড়া দিলেও গলাধঃকরণে একটু তেতোই ঠেকেছিল। অব্রাহ্মণের ছেলে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের গলায় দুর্গার মহিমাগাথা কাব্য শুনে রে রে করে উঠেছিলেন বঙ্গ সমাজের রক্ষণশীলরা। যে মেয়ে কি না ভূস্বামীদের আরাধ্যা, তাঁকে নিয়ে এমন ছেলেখেলা! স্পর্ধা তো কম নয়!
হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না বাণীকুমার। রাতারাতি ‘বসন্তেশ্বরী’র নাম বদলে রাখলেন ‘মহিষাসুর বধ’। স্ক্রিপ্টেও পরিমার্জন করলেন। ঠিক করলেন, ওই বছরই শরতের দুর্গাষষ্ঠীর ভোরে সম্প্রচারিত হবে ‘মহিষাসুর বধ’ শারদ বন্দনা। বাণীকুমাররা দেখলেন, বসন্তের পাতা খসে পড়ার শব্দের সঙ্গে দুর্গার স্তুতি-আলেখ্যকে বেতারে ভাসিয়ে যে সাফল্য আসেনি, সেটা এল শরতের শিউলি সুবাসে। এবারও বাঙালিরা নিল বটে, কিন্তু হৃদয়ে সেভাবে গাঁথল না অনুষ্ঠানটি। ফলে, উমাও আর রাজকীয় মর্যাদা ছেড়ে বেরিয়ে এসে সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারলেন না। খানিক হতাশ হলেও ভেঙে পড়েননি বাণীকুমার। পরের বছর গীতি আলেখ্যে আরও কিছু পরিমার্জন করে ষষ্ঠীর পরিবর্তে মহালয়ার সকালে ‘মহিষাসুর বধ’ সম্প্রচার করলেন। দিনটি ছিল ১৯৩৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। গোঁড়া ব্রাহ্মণরা প্রশ্ন তুললেন, পিতৃপক্ষের শেষে এমন একটা অনুষ্ঠান কেন হবে? সবটাই অশাস্ত্রীয়। তা সত্ত্বেও পর পর তিন বছর অনুষ্ঠানটির লাইভ সম্প্রচার করে গেলেন বাণীকুমার। কিন্তু, সমালোচনার চাপেই হোক কিংবা অন্য কোনও কারণেই হোক, ১৯৩৬ সালে আবারও মহাষষ্ঠীর ভোরে ফিরলেন ‘মহিষাসুর বধ’ শারদ বন্দনা নিয়ে। ১৯৩২-১৯৩৬—এই চার বছরে অনেক কাটাছেঁড়া হল অনুষ্ঠানটির। সেই সঙ্গে দুঃসাহসিক একটা সিদ্ধান্তও নিলেন বাণীকুমার। ‘বসন্তেশ্বরী’তে নিজে চণ্ডীপাঠ করেছিলেন। রক্ষণশীলদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে আনলেন। চণ্ডীপাঠের দায়িত্ব দিলেন অব্রাহ্মণ সন্তান বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে। সিদ্ধান্তের নেপথ্যে সম্ভবত দু’টি দিক মাথায় রেখেছিলেন বাণীকুমার। এক, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের জলদগম্ভীর গলার কারুকাজকে সম্মান দেওয়া। দুই, রক্ষণশীলদের মুখতোড় জবাব দেওয়া। কারণ, তিনি ভালো করেই জানতেন, বৃহত্তর বাঙালি সমাজ বলতে শুধু কতিপয় কূটকাচালি, স্বঘোষিত শাস্ত্রবোদ্ধাদের বোঝায় না। ওরা যা বলে বলুক—এমন থোড়াই কেয়ার ভাব ছিল বাণীকুমারের। সেই সাহসকে সম্বল করে পরের বছর অর্থাৎ, ১৯৩৭ সালে আবারও দলবল নিয়ে ফিরলেন মহালয়ার ভোরে। বেদ-বিধানকে সম্মান দিয়েই। ওই বছরই ‘মহিষাসুর বধ’-এর নাম ফের পরিবর্তন করা হল। অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হল ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ নামে (তবে, ‘গল্পদাদু’ স্মৃতিচারণে বলেছেন, ১৯৩৬ সালে মহিষাসুর সম্প্রচারণের সময় একবার মাত্র এই নামটি ঘোষণা করা হয়েছিল)। রচিত হল বঙ্গ-সংস্কৃতির এক নতুন যুগের। দুর্গার এই মহিমাস্তুতিকে আঁকড়ে বাণীকুমারও চিরকালের মতো বদলে দিলেন বাঙালির পিতৃতর্পণের ভোরকে।
সন্দেহ নেই, বাণীকুমার একজন সফল বেতার উপস্থাপক। বেতারে যোগ দেওয়ার পর থেকে একের পর এক মনোগ্রাহী অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। সহযোগী ছিলেন পঙ্কজ মল্লিক ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ১৯৩১ সালে তাঁর সৃষ্টি ‘বেতার বিচিত্রা’ দুর্দান্ত সফল। আসলে, নিখাদ বাঙালি বাণীকুমার জানতেন, বাঙালির মনের কথা। তার উপর ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সন্তান। বেদ-উপনিষদ-পুরাণে বুৎপত্তি ছিল তাঁর। সেই সূত্রে সম্ভবত ‘শারদেন ঋতুনা দেবা’ শ্লোকটি তাঁর মনে গেঁথে ছিল। ঋগ্বেদের যুগে এই সংস্কৃত শ্লোকের বহুল প্রচলিত ছিল। যার অর্থ, শরৎকালই দেব-দেবীর ঋতু। এই সময়কালে পুজো করলে সকল দেব-দেবীই প্রসন্ন হন। বেদ-বেত্তারাও বলে গিয়েছেন, ভরা শরৎকাল হল রাজসিক দশভুজার আরাধনার শ্রেষ্ঠ সময়। বেদের সঙ্গে বাঙালির আধ্যাত্মিকতার আবেগকে মিশিয়ে মহালয়ার ভোরকেই ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’র লাইভ সম্প্রচারে পাকা বন্দোবস্ত করে দিলেন বাণীকুমার। আর তাতেই বাজিমাত। সুগম হল উমার রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে আসার পথও। এতদিন তাঁর আরাধনা নিয়ে যাঁরা মঙ্গল-অমঙ্গলের হিসেব কষতেন, ভয়-ভীতিতে জড়োসড়ো হয়ে থাকতেন, তাঁরাও সাহস সঞ্চয় করে বলতে লাগলেন—অব্রাহ্মণের সন্তান যদি শ্রীশ্রী চণ্ডীর স্তোত্র পাঠ করতে পারেন, তা হলে আমরাও দুর্গাপুজো করতে পারি। বলতে দ্বিধা নেই, বারোয়ারি দুর্গাপুজোর শুরু ১৭৬১ সালে। সেটাও ছিল দ্বাদশ ব্রাহ্মণ নিয়ন্ত্রিত। তবে, দুর্গার আজকের এই সর্বজনীন হয়ে ওঠা ও ভরপুর উৎসবের চেহারা নেওয়ার পিছনে পুরো অবদানটাই বাণীকুমারের। নিজেও এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনীর অন্তরে নিহিত রয়েছে শাশ্বত ভারতের মর্মকথা…।’ আর সেই ‘মর্মকথা’য় ধনী-দরিদ্র ও জাতপাতের যে কোনও স্থান নেই, তা বলাই বাহুল্য।
‘মহিষাসুরমর্দ্দিনীর’ উতঙ্গ জনপ্রিয়তার মধ্যেও ছোটখাটো ছুরিকাঁচি চালিয়েছেন তিন স্থপতি। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—বাঙালির হৃদয়কে আরও গভীরভাবে স্পর্শ করা। মহড়ার সময় চলত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একদিন মহড়ায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ চণ্ডীপাঠ করছিলেন। হঠাৎই গ্রন্থনার বাংলা ভাষ্যটিও স্তোত্রের সুরে বলতে শুরু করলেন। অন্যান্য কলাকুশলীরা তাজ্জব! বাণীকুমার দ্রুত বেরিয়ে এলেন রেকর্ডিং রুম থেকে। থ মেরে গেলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণও । বাণীকুমার ঠোঁটে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে বললেন, ‘আরে থামলে কেন? বেশ তো হচ্ছিল! হোক না ওই ভাবেই ...।’ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ সহাস্য বললেন, ‘আরে না না একটু দেখছিলাম, কেমন শুনতে লাগে!’ বাণীকুমার বললেন, ‘মোটেও নয়! দারুণ হচ্ছিল! ওইভাবেই আবার করো তো দেখি।’ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ শুরু করলেন—‘দেবী প্রসন্ন হলেন...।’ সেদিনই বাঙালির অস্থি-মজ্জায় মিশে গেল নিরহংকারী, রাজ-বিলাস ছিন্ন করা অন্য এক দুর্গার রূপ। ইতিহাস গড়লেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণও। শুরু হল অন্য ধারার চণ্ডীপাঠ।
আর একযুগ পর শতবর্ষ পূরণ করবে ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’। বিগত ৮৮ বছরে জগৎজোড়া এমন একজন বাঙালিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ না শুনে পিতৃতর্পণে গিয়েছেন। যেতে যেতে গুনগুনিয়ে গেয়ে চলেছেন—তব অচিন্ত্য, রূপ চরিত মহিমা...। আর এখানেই মহান আলোয় বাঙালিয়ানাকে একসূত্রে বেঁধে রাখার দায়িত্বে প্রশ্নাতীত সফল ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’র অন্যতম তিন স্থপতি।