নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: ‘পাড়াটার নাম আর একটু হলেই ‘পাগল’ পাড়া হয়ে যাচ্ছিল। শেষমেশ চাঁদার লোভ দেখিয়ে বর্তমান পরিচিতি প্রাপ্তি হল।’ কৃষ্ণনগরে আজকের অন্যতম ‘এলিট’ এলাকার ইতিহাস বলতে গিয়ে স্থানীয় গবেষক সুপ্রতিম কর্মকারের মুখ দিয়ে একপ্রকার স্লিপ করেই বেরিয়ে এল ধূসর হয়ে আসা এক অনালোচিত ইতিহাস। ভাবা যায়! আজকে যে পাড়ায় তাবড়-তাবড় উকিলরা বাস করেন সেই পাড়াতেই নাকি এককালে উপচে পড়ত পাগল। যার মধ্যে কয়েকজন আবার ‘বিখ্যাত’ হয়ে গিয়েছিল।
Advertisement
বর্তমান কৃষ্ণনগর হোক বা তৎকালীন কেষনগর, খুঁজলে ইতিহাস এখানে হাতছানি দেয় বারে বারে। কেবলই কলকাতা চর্চার যুগে নদীয়ার এই শহর যেন বারে বারে পাতা উল্টে দেখাতে চায় তার অন্দরে-অন্তরে জমে থাকা ইতিহাসের কাহিনি। যা ক্রমে ধূসর হয়ে আসছে। ঠিক যেমন, আজকের উকিল পাড়া আর তার নামকরণের পিছনে মজার কাণ্ডকারখানা। খোঁজ করলে জানা যায়, সে যুগে কৃষ্ণনগরে যাতায়াতের মাধ্যম ছিল একমাত্র ঘোড়ার গাড়ি, আর কিছু হাতেগোনা বিলাসী মানুষের সাইকেল। তাই শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল একাধিক ঘোড়ার গাড়ির স্ট্যান্ড। স্টেশনের পাশাপাশি অন্যতম বড় স্ট্যান্ড ছিল আজকের জজ কোর্টের ঠিক মোড়ে। আর আশেপাশেই ছিল সেই ঘোড়ার গাড়ির চালক বা সহিসদের বাস। বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে একটু মিলিয়ে দেখলে যা দাঁড়ায়, আমিরুদ্দিন পাঞ্জাবি লেন বা নরহরি মুখার্জি লেন এবং তার আশপাশ। তাই এলাকাটির নাম স্বাভাবিকভাবেই সহিসপাড়া হয়ে ওঠে। ঘোড়ার বিষ্ঠার গন্ধের কারণে একসময় ওই এলাকা দিয়ে লোকের যেতেই ভয় পেতেন। পরবর্তীতে অবশ্য যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হলে আস্তে আস্তে ঘোড়ার গাড়ি উঠে যায়। তবে সহিস পাড়া নামটা দীর্ঘদিন চালু ছিল। পরবর্তীকালে এই অঞ্চলে উকিলদের বসবাস শুরু হয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল পাড়ার নাম নিয়ে। হাজার চেষ্টা করেও উকিলপাড়া নামখানা পাকাপোক্ত করা যায় না। এরমাঝে আবার স্থান নামের গাড়ি ছুটল উল্টো পথে। কারণ তৎকালীন সহিসপাড়ায় তখন গাদাখানেক পাগলের বাস। তাদের মধ্যে আবার বেশ কয়েকজনের পাগলামি আবার কৃষ্ণনগরে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসের পাতা উল্টে নাম জানা যায়, হামিজদ্দি, মধু হাঁড়োল, হরিচরণ পাগলা। লোকজন মুখে মুখে সহিসপাড়ার নাম বদলেই ফেলেছিলেন ‘পাগল পাড়া’ বলে। নদীয়ার গবেষক মোহিত রায় তাঁর ‘নদীয়ার স্থাননাম’ বইতে লিখছেন, ‘কৃষ্ণনগরের উকিলপাড়ায় অনেক পাগল অধিবাসী থাকায় পাড়াটির লোকায়ত নাম হয় ‘পাগল পাড়া’। তৎকালীন উকিলরা পড়লেন মহা ফাঁপড়ে। লোককে কী করে বলবেন যে, তাঁর বাড়ি সহিসপাড়া বা পাগল পাড়ায়? লজ্জায় মাথা কাটা যাবে যে! অবশেষে অনেক চিন্তা ভাবনায় বেরল মোক্ষম উপায়। এলাকার নাম উকিল পাড়া করতে টার্গেট করা হল কচিকাঁচাদের। মোটা চাঁদার বিনিময়ে পাড়ার পুজোয় প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ‘উকিলপাড়া’ নামটি। বিষয়টি নিয়ে নদীয়ার গবেষক সুপ্রতিম কর্মকার বলছেন, একবার স্থানীয় একটি সরস্বতী পূজায় সাইনবোর্ড লেখা হল ‘বালক বৃন্দ বারোয়ারি, উকিল পাড়া’। তারা চাঁদা তুলতে গেলে পাড়ার লোকজন যখন জিজ্ঞাসা করত কোন পাড়া থেকে চাঁদা নিতে এসেছ? পাড়ার নাম বললে তবেই চাঁদা মিলবে। সেই তখন কচিকাঁচাদের মুখে ছড়িয়ে পড়ল উকিলপাড়া নামটা। আজকের উকিলপাড়ায় প্রায় কেউই পুরনো নামগুলি জানেন না।



