Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

‘দাদা’দের হাতযশে জমি এখন রাতারাতি অগ্নিমূল্য

‘দাদা’দের হাতযশে জমি এখন রাতারাতি অগ্নিমূল্য
  • ১৩ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: আসানসোলের একটি নির্মীয়মাণ আবাসনের সামনে জোরকদমে চলছে দরদাম। স্ত্রী রীনাকে নিয়ে এসে ফ্ল্যাট পছন্দ করতে এসেছিলেন আসানসোলের বেসরকারি সংস্থার কর্মী প্রীতেশ বসু। কার্যত প্রোমোটারের হাতে-পায়ে পড়ার মতো অবস্থা। ‘২০ লাখে ফ্ল্যাটটা দিয়ে দিন না।’ ভীষণ প্রয়োজন। প্রোমোটারও হাত জড়ো করে অনুরোধ করছেন, ‘২৫ লক্ষ টাকার নীচে বিক্রি করলে আমার ক্ষতি হবে’। মুখ শুকনো করে আবাসন চত্বর ছাড়ার আগে প্রীতেশ বলে গেলেন, দু’মাস ধরে হন্যে হয়ে ফ্ল্যাট খুঁজছি। আমাদের বাজেটের মধ্যে ২বিএইচকে ফ্ল্যাট পাচ্ছি না। এর বেশি টাকা দিলে ইএমআই শোধ করে সংসার চালাতে পারব না। সেই প্রোমোটারের আক্ষেপ, কত মানুষকে যে এভাবে ঘোরাতে হচ্ছে। ২৫ লক্ষ টাকা কাঠায় জমি কিনে এর কমে ফ্ল্যাট দেব কী করে? কয়েক বছর আগেও যে জমি ছিল ১০ লক্ষ, ‘দাদা’দের হাতযশে সেই জমিই এখন ২৫-৩০লক্ষ টাকা কাঠা। 
Advertisement
শিল্পাঞ্চলের নতুন আবাসনে ঢুঁ মারলেই এই চিত্র ভেসে উঠছে। শিল্পাঞ্চলের প্রোমোটিং এখন মফিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। কয়লা, লোহা কারবারের ‘হস্তি’রা‌ এখন জমি কারবারে। কয়লা, লোহা, বালির কালো টাকা জমি কারবারে বিনিয়োগ করে সাদা করা হচ্ছে। নগদ টাকায় বিপুল দাম দিয়ে জমি কিনে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে মাফিয়ারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিহার, ঝাড়খণ্ডের কারবারিরাও। তারাও শিল্পাঞ্চলের জমি কিনতে টাকা ঢালছে। তাতেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জমির দাম। কাঁচা টাকায় জমি বিক্রি করতে মালিক রাজি না হলে অন্য রাস্তা রয়েছে। বাহুবলীদের এগিয়ে দিয়ে তখন শুধু ‘থ্রেট’ কালচার চলে। এভাবেই প্রোমোটিংয়ের ‘বাস্তুতন্ত্র’ ভেঙে জমির দাম মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়েছে মাফিয়ারা। সেই বহুমূল্যবান জমিতে ফ্ল্যাট হলে তার দামও আকাশছোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। তাই মধ্যবিত্ত বা চাকরিজীবীরা শিল্পাঞ্চলে জমি কিনে বাড়ি করতে হিমশিম খাচ্ছেন। নতুন ফ্ল্যাট কিনতেও সমস্যায় পড়ছেন। 
এথোড়া গ্রামের বাসিন্দা প্রসেনজিৎ পুইতণ্ডি বলেন, বাইপাসের(১৯নম্বর জাতীয় সড়ক) ধারের জমিগুলি চোখের সামনে লুট হয়ে গেল। যেসব পরিত্যক্ত খাদানের পাশ দিয়ে আমরা স্কুল যেতাম, কত খাসজমি চোখের সামনে লুট হল। প্রশাসন কিছু করে না। 
কয়েক বছর ধরে জমি হাঙরদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার সাক্ষী এথোড়া, সুইডিল, রঘুনাথবাটি, পশালডিহার মতো জাতীয় সড়কের পাশে থাকা এলাকার মানুষ। আসানসোলের কাল্লা মোড় থেকে নিয়ামতপুর চার পয়েন্ট পর্যন্ত জাতীয় সড়কের দু’পাশজুড়ে সক্রিয় শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী জমি সিন্ডিকেট। কয়েক বছর আগেও রাস্তার দু’পাশজুড়ে ফাঁকা জমি ছিল। এখন দু’পাশ তাকালে শুধুই রঙিন পতাকা পোঁতা জমি। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘দাদা’দের নজর পড়লে জমি তাদের বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। নগদ টাকায় জমি বিক্রির টোপ দেওয়া হবে। তাতে রাজি না হলে জমিটি তাদের পছন্দের প্রোমোটারের সঙ্গে এগ্রিমেন্ট করাতে হবে। এর অর্থ, সেই জমি যত বছর পর প্রোমোটার মোটা দামে বিক্রি করবে ততদিন পর্যন্ত জমি মালিককে অপেক্ষা করে থাকতে হবে। তিনি জমি অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারবেন না। যদি বিক্রির চেষ্টা করেন দাদার ‘বাহুবলী’ বাহিনী রাতে চড়াও হবে বাড়িতে। একই কারবার চলছে কুলটির মেনধেমো থেকে অণ্ডাল, দুর্গাপুর সর্বত্র। 
এত অরাজকতার পরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? শিল্পাঞ্চলে কান পাতলেই শোনা যায়, কে ব্যবস্থা নেবে? রাজনৈতিক নেতা থেকে পুলিসকর্তা সবার টাকাই নাকি খাটছে এই জমি কারবারে। (চলবে)
সম্পর্কিত সংবাদ